Home ইসলামিক বিষয়াদি দেখুন বদর প্রান্তর বদর প্রান্তর-পর্ব :২০ (রাফিদার দুষ্টুমি , ইবন উবাই-এর ষড়যন্ত্র ), ইসলামীক...

বদর প্রান্তর-পর্ব :২০ (রাফিদার দুষ্টুমি , ইবন উবাই-এর ষড়যন্ত্র ), ইসলামীক সিরিজ, চলবে…….

রাফিদার দুষ্টুমি

মাসউদ এবং রাফিদা উভয়েই যুহরীর তাঁবুতে রাত্রিযাপন করলাে। সুবহে সাদেকের সময় উঠে দুজনেই ফজরের নামায আদায় করলাে। সালিমা, তার আম্মু, তার ভাই ও পিতা স্ব স্ব কাজে মশগুল। 

মাসউদ বললােঃ রাফিদা ! তুমি তাে এখনও সফরের যােগ্য হয়েছে বলে মনে হয়নি। | 

রাফিদা মুচকি হাসলাে। সে বললাে, মনে হয় আরও কিছুকাল এখানে অবস্থান করতে মনস্থ করছেন। | 

মাসউদঃ আমার ইচ্ছা…….। না, আমি আর থাকতে ইচ্ছে করছি না। এখানে থেকে আমার কি কাজ? | 

রাফিদা হেসে উঠলাে। সে বললাে, কাজ তাে নেই তবুও অবস্থান করতে চাচ্ছেন।

মাসউদঃ যদি তুমি থাকতে চাও, তাহলে বাধ্য হয়ে আমাকেও থাকতে হবে।

রাফিদাঃনা, আমি আপনাকে বাধ্য করতে চাই না। আমি প্রস্তুত। উটনী প্রস্তুত করুন। 

মাসউদ ঃ আচ্ছা, ঠিক আছে আমি যুহরীর কাছ থেকে আর তুমি উম্মে সালিমার কাছ থেকে অনুমতি নাও।

রাফিদাঃ আমার ধারণা, সালিমার কাছ থেকে আপনার অনুমতি নেয়া উচিত।

মাসউদ মনে করেছিলাে, তার মনের চোর সম্পর্কে কেউ অবহিত নয়। কিন্তু ভিতরে ভিতরে রাফিদা তা ধরে ফেলেছিলাে। তাই মাসউদ উদ্বিগ্ন

হলাে। সে কথা বানিয়ে বললাে, সালিমার কাছ থেকে অনুমতি, মানে?

রাফিদাঃ নিজের মনকে প্রশ্ন করুন।

এরা দুজন তাঁবুর বাইরে বসে কথােপকথন করছিলাে। ঘটনাক্রমে সালিমাও মাসউদ ও রাফিদার অজান্তে সেখানে এসে পৌছলাে। তারা দুজনের কেউ টের পেলাে না, তাকে দেখতে পেলাে না। সে এসে একেবারে তাদের। নিকটবর্তী হয়ে গেলাে। তাদের কথা শুনতে পেলাে। সে লুকিয়ে রইলাে। খেজুরগাছের ডালার পিছনে।।

মাসউদঃ সালিমাকে বােধহয় তােমার কাছে খুব ভালাে লাগে?

 রাফিদাঃ নিজের কথা বলুন।

মাসউদঃ আমার কথা বলছাে তুমি? আমার কাছে তাে প্রতিটি মেয়েই ভালাে মনে হয়।

রাফিদাঃ তবে সালিমাই বােধহয় সবচেয়ে প্রিয়।

মাসউদঃ আরেক বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছে। যেতে চাইলে তাড়াতাড়ি করাে। জলদি প্রস্তুতি নাও।

রাফিদা ঃ আমার আর কি প্রস্তুতির প্রয়ােজন। উটনী প্রস্তুত করুন। 

মাসউদ ঃ যদি পথিমধ্যে জ্বরাক্রান্ত হয়ে পড়ে তাহলে ?

রাফিদা ঃ আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, আমার জ্বর আসবে না। 

মাসউদঃ তাহলে চলাে।

দুজনেই উঠে দাঁড়ালাে। খেজুরের ডাল এতটুকু মােটা ছিলাে না যে, পিছন দিক থেকে সালিমাকে দেখা যায় না। সালিমা পূর্ব থেকেই আশংকা করছিলাে যে, হয়তাে তারা তাকে দেখে ফেলবে। এজন্য এ দুজনের দাঁড়ানাের সাথে সাথেই খেজুরগাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে দূর থেকে বলতে লাগলাে আপনারা দুজন নির্জনে এখানে কি আলাপচারিতায় লিপ্ত? | 

মাসউদ তাকে দেখলাে! নজর আর ফিরাতে পারলাে না। রাফিদা তাকে বললাে যে, রওয়ানা সম্পর্কে আলােচনা হচ্ছিলাে। | 

সালিমা তার কাছে এসে দাঁড়ালাে। সকাল বেলা সালিমার চেহারা লাল সন্দর টকটকে ফলের মতাে মনে হচ্ছিলাে। 

সে তাকে লক্ষ্য করে বললাে, আপনাদের কষ্ট হচ্ছে?

রাফিদাঃ তকলীফ ! ঘরের মতই তাে আরাম পেয়েছি।

সালিমাঃ তাহলে তাড়াহুড়া করছেন কেন? তােমার শরীর কি এখনই সুস্থ হয়ে গেছে?

রাফিদাঃ আমার শরীর পুরােপুরি ঠিক হয়ে গেছে। 

সালিমা ঃ আচ্ছা আম্মুর কাছে জিজ্ঞেস করুন।

মাসউদঃ আমি তাকে প্রথমেই বলেছিলাম, কিন্তু রাফিদা একধরনের জেদী মেয়ে। | 

সালিমা মাসউদকে তাকিয়ে দেখলাে। মায়াবিনী এই চেহারার চি মাসউদও দৃষ্টিপাত করলাে। চার দৃষ্টি একত্রিত হলাে। মাসউদের মনে কম্পন সৃষ্টি হলাে। সালিমা বললাে, জেদের কথা তাে ভিন্ন, অন্যথায় এখনাে তার আরামের প্রয়ােজন রয়েছে।।

মাসউদঃ কিন্তু তাকে বুঝাবে কে?

রাফিদা মুচকি হেসে বললাে, আমি তাে প্রথমেই অনুধাবন করেছিলাম, তিনি এখান থেকে যেতে চাচ্ছেন না। মন তাকে যেতে দেয় না। সালিমার চেহারা তখন প্রফুল্ল হয়ে উঠলাে। সে বললাে, কিন্তু আপনার মন কি যেতে চাচ্ছে?

রাফিদাঃ আমার যাওয়া আর থাকার প্রশ্নই নাই, তিনি থাকলে আমি ও থাকবো। তিনি চলে গেলে আমিও চলে যাবাে।

সালিমা ঃ তুমি ঠিক বলেছাে। সে বিস্ময়কর মনােহারী দৃষ্টিতে মাসউদের দিকে তাকাচ্ছিল। এবার আপনি বলুন।।

মাসউদ অনিচ্ছাকৃতভাবে বলে ফেললাে, আমার সিদ্ধান্ত তােমার উপর নির্ভরশীল। তুমি যা হুকুম দিবে আমি তাই করবাে।

রাফিদাঃ বেচারা মজনু হয়ে গেছে। এ কথা বলেই দুষ্টুমীর দৃষ্টিতে রাফিদা মাসউদের দিকে তাকালাে। | 

মাসউদ বললাে, এটা হলাে বােনের পক্ষ থেকে ভাইকে সম্বােধন।।

এবার রাফিদা পর্দার আড়ালে চলে গেলাে। হাজির হলেন উম্মে সালিমা। তিনি এসে বললেন, তােমরা তিনজন এখানে দাঁড়িয়ে কি আলােচনা করছাে? তােমরা কি নাস্তা খাবে না ?

সালিমা ঃ রাফিদা চলে যাওয়ার কথা বলছে।

উম্মে সালিমাঃ এখনও তােমার শরীর পুরােপুরি সুস্থ হয়নি। 

রাফিদা দেখতাে, ফুলের মত চেহারা শুকিয়ে চুপসে আছে। 

রাফিদা ঃ আম্মু ! আপনার অনুমতি ছাড়া আমরা যাবাে না। 

উম্মে সালিমাঃ স্বীকার করছাে? 

রাফিদা ঃ হাঁ, স্বীকার করছি।

উম্মে সালিমা ঃ এসাে তাে আগে নাস্তা করে নাও। সবাই তার পিছু পিছু চললাে। তাঁবুর ডানদিকে একটি ছায়াদার জায়গা ছিলাে। তার নিচেই যুহর এবং নাইল বসে ছিলেন। মাসউদ তাদের কাছে এবং সালিমা, রাফিদা তালে সামনে গিয়ে বসলাে। নাইলের আঁখিযুগল রাফিদার সৌন্দর্যমণ্ডিত চেহারার

উপর স্থির হয়ে গেলাে। 

উম্মে সালিমা বললেন ঃ রাফিদা যেতে চাচ্ছে। এ কথা শােনা মাত্রই যেন নাইলের দেহে একটি ঘুষি পড়লাে। চেহারা তার ফ্যাকাশে হয়ে গেলাে। আবেদনের দৃষ্টিতে সে রাফিদার দিকে তাকালাে। যেন সে বলছে, তুমি যেয়াে না। এখানেই অবস্থান করাে। রাফিদার নজরও তার। প্রতি নিবদ্ধ হলাে। সেও সবকিছু অনুধাবন করতে পারলাে।

যুহরী বললেন ঃ বেটি ! এখন তােমরা কোথাও যেয়াে না। এখানেই থাকো। জানতে পারলাম, কুরাইশ এবং মুসলমানদের মধ্যে সংঘর্ষ আরম্ভ হয়েছে। পথ বিপদজনক।।

মাসউদ চৌকান্না হয়ে যুহরীর দিকে তাকালাে এবং জিজ্ঞেস করলাে, যুদ্ধের সিদ্ধান্ত কি হয়ে গেছে?

যুহরী ঃ কুরাইশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে। এজন্য মনে হচ্ছে যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী। 

| মাসউদঃ তাহলে তাে আমাদেরকে মদীনায় পৌঁছে যেতে হবে।। 

যুহরীঃকেন?

মাসউদঃ মুসলমানরা সংখ্যালঘু। আমি তাদের সেনাবাহিনীতে অংশগ্রহণ করবাে। মনে হয় আল্লাহ তাআলা জিহাদের হুকুম দিয়েছেন।

যুহরী ঃ জিহাদের নির্দেশে ব্যাপক মুসলমানদের আনন্দিত ও প্রফুল্ল মনে হচ্ছে। ব্যাপার কি? |

মাসউদঃ মুসলমানগণ এতদিন পর্যন্ত কষ্ট-তকলীফ সহ্য করে আসছেন। তারা অপেক্ষমান ছিলেন আল্লাহর নির্দেশের। আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের অসহায়ত্ব এবং অপারগতার প্রতি অনুকম্পা করে জিহাদের নির্দেশ দিয়েছেন। এবার মুসলমানরা প্রতিশােধ নিতে পারবেন।

 উম্মে সালিমা নাস্তা হাজির করলেন। একদিকে তিনি নিজেও বসে গেলেন। সবাই নাস্তা খেতে আরম্ভ করলাে। রাফিদা লাজুক নববধুর ন্যায় ছােট ছােট লােকমায় খাচ্ছিলাে। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই সবার নাস্তার কাজ সমাপ্ত হলাে। উম্মে সালিমা ঝুটা ইত্যাদি এখান থেকে সরিয়ে নিলেন। মাসউদ যুহরীকে সম্বােধন করে বললাে ঃ এবার আমাদের অনুমতি দিন। |

 যুহরীঃ বেটা ! তােমাদের দুই ভাইবােনের প্রতি আমার স্নেহ-মহব্বত সৃষ্টি হয়ে গেছে। যেমন ভালােবাসা ও স্নেহ-মমতা সৃষ্টি রয়েছে নাইল এবং সালিমার প্রতি। আমার মনােবাসনা হচ্ছে তােমরা দুজন এখানে থাকো। কিন্তু। যদি যেতেই চাও তাহলে আমি আর জোর করবাে না।।

সালিমা ঃ রাফিদাকে তাে আমি কখনাে যেতে দেব না।। জুহরী ও বেটি ! আমরা তাে জোর-জবরদস্তি করতে পারি না। এটা মাসউদের মর্জি। সে চাইলে রাফিদাকে রেখে যেতে পারে, অন্যথায় সাথে নিয়ে যেতে পারে।

মাসউদ ঃ আপনার সাথে মুসলমানদের সাথে কোন চুক্তি হয়েছে? 

যুহরীঃ হাঁ, আমরা তাদের মিত্র। ‘ 

মাসউদ রাফিদাকে সম্বােধন করে বললাে ঃ তুমি এখন আমার সাথে। মদীনায় যাবে, না আমার প্রত্যাবর্তন পর্যন্ত এখানেই অবস্থান করবে ?

রাফিদাঃ আমি সালিমা আপুর কাছে থেকে যাবাে।। এতদশ্রবণে সালিমা এবং নাইলের চেহারা চমকে উঠলাে।।

মাসউদ ঃ আচ্ছা ঠিক আছে, তুমি এখানেই থেকে যাও। আমি যাচ্ছি জিহাদে অংশগ্রহণ করতে। যদি জীবিত থাকি তাহলে ফিরে আসবাে আর যদি প্রত্যাবর্তন না করি তাহলে তােমার ইচ্ছা—মদীনায় চলে যাবে অথবা যেখানে ইচ্ছে যেতে পারাে। এই বলে সে উঠলাে। নাইল তার সাথে আলিঙ্গন করলাে। তার উট প্রস্তুত করে নিয়ে এলাে। মাসউদ নাইল, যুহরী এবং উম্মে সালিমাকে অভিবাদন জানিয়ে রওয়ানা করলাে।

ইবন উবাই-এর ষড়যন্ত্র

অসহায় মুসলমানরা জিহাদের জন্য প্রস্তুতি শুরু করেছেন। প্রস্তুতি আর কি নিবে, তাদের কাছে তেমন কোন অস্ত্র-শস্ত্র ছিলাে না। তাদের কাছে। ছিলাে না লৌহবর্ম এবং অন্যান্য সমসাময়িক অস্ত্র-শস্ত্র। যাদের কাছে। তলােয়ার ছিলাে, তারা তলােয়ার ধার করছিলেন। যাদের কাছে নেজা ছিলাে, তারা সেগুলাে ধারাচ্ছিলেন। তীরের পাখাগুলােকে সােজা এবং চোখা বানাচ্ছিলেন। মদীনার মুশরিক এবং ইয়াহুদীরা জানতে পারলাে যে, মুসলমানরা যুদ্ধ প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তারা অনতিবিলম্বেই মক্কাবাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে রওয়ানা করবেন। তারা এটাও জানতে পেরেছিলাে যে, মক্কাবাসী খুব। শান-শওকত ও আঁকজমকে বিশাল অস্ত্রসম্ভার সহকারে বিরাট বাহিনী নিয়ে। আসছে। তাদের ধারণা ছিলাে, মুসলমানরা সংখ্যালঘু। তারা দুর্বল, নিরীহ, নিরস্ত্র। এরা কিছুতেই কুরাইশের বিরুদ্ধে জিতে উঠতে পারবে না। মুশরিকদের মধ্যে এরূপ, কিছু লােক ছিলাে যারা মুসলমানদের সাথে মিলে। মিশে চলতাে। বাহ্যতঃ তারা ছিলাে মুসলমানদের প্রতি সহানুভূতিশীল কিন্তু নেপথ্যে তারা লিপ্ত ছিলাে মুসলমানদের মূলােৎপাটনে। তাদের নেতৃত্ব দান। করছিলাে আবদুল্লাহ ইবন উবাই।

সে যখন জানতে পারলাে, মুসলমানরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন তখন খব আনন্দিত হলাে। সে মনে করেছিলাে, মক্কাবাসীদের সাথে মুসলমানদের সংঘর্ষে এরা অবশ্যই মারা পড়বে। সে ভাবলাে, মুসলমানদের মধ্যে কুধারণা, কাপুরুষতা, হীনমন্যতা এবং ভয়-ভীতি সৃষ্টি করে দেয়া হবে। অথবা তাদের মধ্যে অনৈক্য ও ফাটল সৃষ্টি করে দেয়া হবে। ফলে সে মদীনাবাসীদের প্রতি সহানুভূতিশীলরূপে শয়তানের মতাে তাদেরকে প্রতারিত করতে লাগলাে। বারবার তাদের কাছে গেলাে। সর্বপ্রথম গেলাে সাদ ইবন মুয়ায (রাঃ)-এর কাছে। তার কাছে যেয়ে বললাে ও আপনার প্রতি আমি বড়ই সহানুভূতিশীল। আপনি মুসলমান হয়েছেন, ভালাে করেছেন। হয়তাে আপনি এ ধর্মকে ভালাে। মনে করেছেন। মুহাম্মাদ (সাঃ) এবং মুসলমানদের সাহায্য সহযােগিতা করাও অসংগত-অনুচিত কোন ব্যাপার নয়। মদীনার উপর মক্কাবাসীরা হামলা করলে চুক্তি মােতাবেক আপনারা এবং আমরা সবাই মিলে মােকাবিলা করতাম। কিন্তু মুহাম্মাদ (সাঃ) মদীনার বাইরে যেয়ে তাদের বিরুদ্ধে মােকাবিলা করতে চাচ্ছেন। আমাদের এবং আপনাদের এইরকম কোন চুক্তি ছিলাে না। আমাদের এবং আপনাদের এখানেই থাকা উচিত। আপনি তাদের সাথে যাবেন না। 

সাদ (রাঃ) কড়া দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালেন এবং বললেন ঃ তুমি আমাকে বিভ্রান্ত করতে এসেছাে? তুমি জানাে না আমরা মদীনার আনসারীরা রসূলুল্লাহ (সাঃ)কে কতটা ভালবাসি? তাঁর কতটা আনুগত্য করি ? তিনি লড়তে যাবেন আর আমরা এখানেই বসে থাকবাে? এটা আমাদের শান। পরিপন্থী। সহানুভূতির বিরােধী, মহবত-ভালােবাসা ও ভ্রাতৃত্বের খেলাফ। আবদুল্লাহ ইবন উবাই লজ্জায় মুখ লাল করে সেখান থেকে প্রস্থান করলাে। এরপর আর কোন কথা বলার ধৃষ্টতা তার হলাে না।

সেখান থেকে উঠে সে চলে গেলাে আউস ইবন সাবিত-এর নিকট। তার কাছে যেয়ে বললাে, মক্কার কুরাইশরা পরিপূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে আসছে। মুসলমানরা কোনক্রমেই তার মােকাবিলা করতে পারবে না। সাদ ইবন মুয়াযকে আমি বলেছিলাম, আপনারা মুহাজিরদের সাথে যাবেন না। তিনি বলেছেন, আপনি যথার্থ পরামর্শ দিয়েছেন। আমিও তাই ভেবেছিলাম। যাবার। ব্যাপারে আমি বিভিন্ন রকমের টালবাহানা করবাে। আপনি আউস এবং অন্যান্যদের বলবেন, তারা যেন না যান। কেন তারা নিজের জাতিকে ধ্বংস করতে যাবেন। ঝগড়া তাে কুরাইশের সাথে মুহাম্মাদ ও তার সাথী-সঙ্গীদের। সাথে। আমাদের সাথে তাে কোন বিরােধ নেই। আমরা গায়ে পড়ে কেন তাদের। শত্রু হবাে। আমি আপনার কাছে এসেছি, আপনিও যাবেন না।

আউস তীক্ষ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালেন। বললেনঃ আউযুবিল্রাহি মিনাশ শায়তানির রাজীম। অর্থাৎ, বিতাড়িত শয়তান থেকে আমি আল্লাহ কাছে পানাহ চাইছি। বস্তুতঃ তুমি এক মানব শয়তান। এসেছাে আমাকে বিভ্রান্ত করার জন্যে। সাদ ইবন মুয়ায ইসলামের একজন বীর সেনানী। তিনি আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ-এর ভাই। কখনও তিনি এরূপ কথা বলতে পারেন না। আমরা কোন পার্থিব স্বার্থে মুহাম্মাদ (সাঃ)এর সঙ্গ অবলম্বন করিনি। তাঁকে আল্লাহর রাসূল মনে করি। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশে তাঁর সাথে চলছি। জীবন-মৃত্যু আমাদের তারই সাথে। তিনি মদীনায় থেকে লড়াই করলে আমরা তাঁর সাথে আছি। মদীনার বাইরে গিয়ে যুদ্ধ করলেও আমরা তাঁর সাথে থাকবাে।

ইবন উবাই এখানেও সফল হলাে না। তার ভাবনা ছিলাে আউস তার। কথাবার্তা শুনে সাদের প্রতি কুধারণা পােষণ করবেন। কিন্তু তিনি তার কথাই বিশ্বাস করলেন না। ফলে, আবদুল্লাহ ইবন উবাই এর চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে। গেলাে। সে তাে মুসলমানদের বিরােধিতা এজন্যেই করছে যে, তার কাল্পনিক রাজপ্রাসাদ ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। এখনও পর্যন্ত আউস এবং খাযরাজ উভয় গােত্রের উপর তার অনেকটা প্রভাব রয়েছে। কিন্তু উভয় কবীলার কিছু সম্মানিত ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করে ফেলেছেন। তাদের ইসলাম গ্রহণের কারণে আবদুল্লাহ ইবন উবাই এর শান ও প্রভাবে ভাটা পড়েছে। সে শাহী মুকুট যেটি উভয় গােত্র মিলে তৈরী করেছিলাে, যে রাজমুকুট কিছুদিনের মধ্যে তার মাথায় পরানাে হতাে সেসব ভেস্তে যাচ্ছে। রাজত্ব তার হাত থেকে ছুটে যাচ্ছে।

ইবন উবাই আউসের কাছ থেকে উঠে চলে এলাে। এবার সে আরেকটি পদ্ধতি অবলম্বন করলাে। গেলাে মুহাজিরদের কাছে। সে জানতাে আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ), নম্র স্বভাবী এবং দয়াপ্রবণ, ভদ্র, সুসভ্য এবং মজবুত ব্যক্তি। তিনি তার কথা মনােযােগ দিয়ে শুনবেন। এজন্য সে হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ)-এর কাছে গিয়ে পৌছলাে। 

আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) তার সম্পর্কে ওয়াকিফহাল ছিলেন। ইবন উবাইকে দেখে হযরত সিদ্দীকে আকবর (রাঃ) বললেন, কি ব্যাপার ইবন উবাই? কি মনে করে আসলেন?

ইবন উবাইঃ কি বলবাে, হয়তাে আপনি জানেন, মুসলমানদের প্রতি আমার প্রচর সহানুভূতি রয়েছে। সম্ভবতঃ আপনি এটাও জানতে পেরেছেন যে, মদীনাবাসী আমাকে তাদের সম্রাট বানাতে চেয়েছিলাে। রাজমুকুটও তার তৈরী করেছিলাে। এমতাবস্থায় আপনাদের রাসূল আগমন করলেন। লােকজন

আমার কাছে আবেদন করেছিলাে যেন অতি দ্রুত মুকুট পরানাের সেই অনুষ্ঠানটি আমি করে ফেলি। কিন্তু আমি তাদের বুঝালাম, এখন নয়। যেসব মুসলমান মদীনায় আগমন করেছেন প্রথমে দেখাে শহরবাসী তাদের সাথে কি ব্যবহার করে। তারাও শহরবাসীর সাথে কিরূপ আচরণ করে। ফলে আমি তখন মাথায় রাজমুকুট পরার সেই অনুষ্ঠানটি স্থগিত করে রেখেছি। আপনারা এসেছেন আর শহরবাসী আপনাদের সাথে এবং আপনারা শহরবাসীদের সাথে সদ্ব্যবহার দেখিয়েছেন। হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)এর প্রভাব-প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পেতে আরম্ভ করেছে। এতে আমি বড়ই আনন্দিত। তিনি আন্তর্জাতিক আরেকটি চুক্তিও করেছেন। এতে আমি আরও বেশী খুশী হয়েছি। আমার মনের তামান্না হচ্ছে, সে রাজমুকুটটি যেন মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর মাথায়ই পরিয়ে দেওয়া হয়।

আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) হাতের ইশারায় তাকে আলােচনা থেকে বারণ করলেন। সে খামােশ হলে আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) বললেনঃ এরূপ কথা বলবেন না, ইবন উবাই! ফখরে দোআলম হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) রাজত্বের কোন আকাংখাই পােষণ করেন না। তিনি আল্লাহর রাসূল। মহান রাব্বুল আলামীনের পয়গাম্বর। তাঁর আগমন ঘটেছে সৃষ্টিকে শিরক-কুফর থেকে  বাঁচানাের জন্য। খােদাদ্রোহীদেরকে আল্লাহর সামনে আত্মসমর্পণ করানাে এবং ভ্রান্ত উপাসনা থেকে সরিয়ে প্রকৃত উপাস্য আল্লাহ রাববুল আলামীনের ইবাদতের দিকে পথপ্রদর্শনের জন্য। তিনি রাজমুকুট অথবা রাজত্বের কোন মনােবাসনাই পােষণ করেন না। এই তামান্না তাঁর অন্তরে নেই।

ইবন উবাইঃ তিনি চান না। তবে আমি নিজ থেকে আমার মনের কথা প্রকাশ করলাম।।

আব বকর সিদ্দীক (রাঃ)ঃ এটাই যখন আপনার মনের আশা তাহলে আপনি ইসলাম গ্রহণ করছেন না কেন?

ইবন উবাইঃ  এটা ধর্মীয় ব্যাপার। একটি ধর্ম বর্জন করা সহজ ব্যাপার নয়। যে ধর্মের উপরে আমাদের পিতা-প্রপিতারা ছিলেন, যে ধর্মের কোলে আমাদের চোখ উন্মেলিত হয়েছে, ক্ষণিকের মধ্যেই সেই ধর্ম কিভাবে বিসর্জন দেই?

আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) ঃ আপনি ঠিক বলেছেন। বাপ-দাদাদের ধর্ম বর্জন করা জটিল কাজ। কিন্তু আল্লাহ রাব্বল আলামীন আমাদের প্রতি এই এহসান করেছেন যে, সর্বপ্রথম আমাদেরকে সৃষ্টির সেরা বানিয়েছেন। তার দ্বিতীয় অনুগ্রহ হলাে, আমাদেরকে বুদ্ধি-জ্ঞান দান করেছেন। আমাদের দায়িত্ব হলাে, সেই বুদ্ধি-বিবেককে কাজে লাগানাে এবং চিন্তা-ফিকির করে কাজ

করা। আমাদের হাতে গড়া প্রতিমাগুলাে কি উপাস্য হতে পারে ? ওগুলাের কোন শক্তি আছে ? ওগুলাের মধ্যে যদি কোন শক্তি-সামর্থ্য থাকতাে তাহলে। কি মানুষের হাতে এগুলােকে তৈরী করা সম্ভব হতাে? এগুলাে তাে নিজে। নিজেই তৈরী হয়ে যেতাে। অতএব, এসব প্রতিমার পূজা-অর্চনা কেন। করছেন? ওগুলাে বাদ দিয়ে সেই সত্তারই ইবাদত করা উচিত যিনি সেসব। প্রতিমাকে সৃষ্টি করেছেন।

ইবন উবাইঃ এই প্রতিমাগুলােকে তৈরী করেছে মানুষ। মানুষ কিভাবে পূজনীয় হতে পারে?

আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) ঃ আফসােস! সেসব লােকের উপর যারা এতটুকু চিন্তা করতে পারে যে, মানুষ উপাস্য হতে পারে না। অথচ তারা এতটুকু ফিকির করে না যে, মানুষের বানানাে প্রতিমাগুলাে কিভাবে উপাস্য হতে পারে। | 

ইবন উবাই ঃ আপনি সত্য বলেছেন। আমরা কখনও এতটা গভীরে যেয়ে চিন্তা করিনি। এসব বিষয়ে গভীরভাবে লক্ষ্য করিনি।

আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ)ঃ অতীতে যদি চিন্তা না করে থাকেন তাহলে এখন করুন।

ইবন উবাইঃ আপনার আজকের আলােচনা আমার চক্ষু খুলে দিয়েছে। আমি আপনাকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি অবশ্যই এসব বিষয় নিয়ে গভীরভাবে গবেষণা করবাে।

আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ)ঃ আল্লাহ আপনাকে সত্য পথ প্রদর্শন করুন।। 

ইবন উবাই ঃ যে কথাটি আমি বলতে এসেছিলাম, সেটি বলাই হলাে না। 

আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) ঃ বলে ফেলুন।

ইবন উবাই ঃ আমি জানতে পেরেছি, মক্কাবাসীদের উপর আক্রমণ করার জন্য রাসূলুল্লাহ (সাঃ) অভিযানে বের হতে যাচ্ছেন।

আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) ঃ আপনি ভুল শুনেছেন। ব্যাপারটি হলাে, মক্কাবাসী আমাদের উপর আক্রমণ করার জন্য আসছে। আমরা যাচ্ছি তাদের প্রতিহত করতে। | 

ইবন উবাইঃবিষয়টি বােধ হয় তাই হবে। সারকথা, আপনারা মক্কাবাসীদের বিরুদ্ধে লড়তে যাচ্ছেন। |

আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ)ঃ এখনও আপনি ভুল বুঝেছেন। আমরা লড়তে যাচ্ছি না বরং আমাদের বিরুদ্ধে যারা লড়তে আসছে তাদের মুকাবিলা করতে যাচ্ছি। তারা যদি আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করে, পিছু হটে যায়, আমরাও তাদের বিরুদ্ধে লড়তে যাবাে না। আমরা ফিরে চলে আসবাে।

ইবন উবাই ঃ আমি বিষয়টি বুঝতে পেরেছি। আপনারা বােধহয় আনসারীদেরকেও নিজেদের সাথে নেয়ার জন্য প্রস্তুত করেছেন। |

 আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) ঃ আমরা তাদের উদ্বুদ্ধ করিনি। তারা নিজেরাই আমাদের সাথে যাওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ হয়েছেন।

ইবন উবাইঃ কিন্তু আনসারীরা এই অভিযানে যেতে অপ্রস্তুত। তাদের মধ্যে বাদানুবাদ হচ্ছে। তারা বলতে চায়, আমাদের চুক্তি ছিলাে কেউ যদি মদীনার উপর আক্রমণ করতে আসে তাহলে আমরা তাদের প্রতিহত করবাে। বাইরে যেয়ে কেন আমরা যুদ্ধ করবাে?

আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) ঃ ইবন উবাই! আপনার আলােচনা থেকে ফিতনার গন্ধ আসছে।

ইবন উবাই ঃ আমি সত্য বলছি।

আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) ঃ আনসারীদের প্রতি আমাদের পূর্ণ আস্থা আছে। তারা কখনও এরূপ বলতে পারেন না। এসব কথা বলে আপনার কি মতলব ?

ইবন উবাই ঃ এটাই যে, আপনারা তাদের ধর্তব্যে আনবেন না। আপনাদের কথায় তারা যদি রওয়ানাও করে তাহলেও পথিমধ্য থেকে প্রত্যাবর্তন করবে।

আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) ঃ তারা মুসলমান এবং পাক্কা মুসলমান। ইবন উবাই! আমরা তাদের প্রতি পূর্ণ আস্থা রাখি। আপনার শয়তানী কথাবার্তায় আমরা বিভ্রান্ত হবাে না। ইবন উবাই এখানেও ক্ষিপ্ত হলাে। ব্যর্থ হলাে। লজ্জিত হয়ে এখান থেকে প্রত্যাবর্তন করলাে।

চলবে..

ইসলামিক সিরিজ….

ভাল লাগলে নিচের কমেন্ট বক্সে মতামত জানাবেন







LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

নবীজির জীবনে ব্যবসা-বাণিজ্য

পুরো পৃথিবী সৃষ্টিকারী এবং প্রতিপালনকারী মহান আল্লাহ। রুটি-কাপড় এবং বাসস্থান হল মানুষের মৌলিক প্রয়োজন। . প্রয়োজন পুরা করার জন্য মানুষ...

রেকর্ড ভেঙে ইতিহাসের সর্বোচ্চ চূড়ায় রেমিট্যান্স.

করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যেও ইতিহাসের সব রেকর্ড ভেঙে জুলাই মাসে ২৬০ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। অতীতে কখনও এক...

বিদেশ গামী ব্যক্তিদের করোনা টেস্ট করার_নিয়মাবলীঃ

বহুদিন পর আন্তর্জাতিক বিমান খুলে দেয়ার পর অনেকেই দেশের বাহিরে যাওয়ার কথা ভাবছেন। কিন্তু সে ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট...

পবিত্র জুমা আদায়ের মধ্য দিয়ে মসজিদের মহান গৌরব ফিরে পেল আয়া সোফিয়া

ইতিহাসের স্বাক্ষী হতে আয়া সোফিয়ায় নামাজে উপস্থিত ছিলেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইপ এরদোয়ান। নামাজের আগে বিশেষ দোয়া অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে কুরআন...

Recent Comments

John Doe on TieLabs White T-shirt