Home ইসলামিক বিষয়াদি দেখুন বদর প্রান্তর বদর প্রান্তর-পর্ব :২১ (মুজাহিদদের অভিযাত্রা, জিহাদের স্পৃহা ), ইসলামীক সিরিজ, চলবে…….

বদর প্রান্তর-পর্ব :২১ (মুজাহিদদের অভিযাত্রা, জিহাদের স্পৃহা ), ইসলামীক সিরিজ, চলবে…….

মুজাহিদদের অভিযাত্রা

 রাসূলে আকরাম (সাঃ) সাহাবায়ে কেরামকে যুদ্ধ প্রস্তুতির নির্দেশ দিলেন। | সেদিন রাত্রে মদীনায় ঈদের রাত্রের মতাে হৈচৈ হচ্ছিলাে। বেশির ভাগ মুসলমান রাত্রে ঘুমাননি। একজন অপরজনের কাছে যাতায়াত দেখা সাক্ষাৎ করলেন। সামান্য কিছু সময় ঘুমিয়েছেন রাত্রের শেষ প্রহরে। সকালে আযান শােনা মাত্রই সবাই ঘুম থেকে জাগ্রত হয়েছেন। খুব দ্রুত নিজেদের মানবিক প্রয়ােজন সেরে মসজিদে নববীতে পৌছলেন। দুই রাকাত সুন্নত নামায আদায় করলেন। অতঃপর জামাআত সহকারে দুই রাকাত ফরয নামায আদায় করলেন। সবাই নিরব হয়ে বসলেন নামায শেষে। কেউ কেউ ক্ষীণ আওয়াজে

কুরআন তেলাওয়াত করতে লাগলেন। সূর্যোদয়ের পর মহানবী (সাঃ) ইশরাকের নামায আদায় করলেন এবং অন্যান্য অনেক সাহাবীও ইশরাক পড়লেন।

 নামায শেষে প্রিয়নবী (সাঃ) সাহাবায়ে কেরামকে সম্বােধন করে বললেনঃ হে আমার সাহাবী সম্প্রদায়! তােমরা শুনেছাে, মক্কা থেকে কাফিররা আমাদের উপর আক্রমণ করার জন্য আসছে। তােমরা এটাও শুনেছাে যে, আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে কুরাইশের যে বাণিজ্যিক দলটি শাম থেকে আসছিলাে। তারাও মুসলমানদের হাত থেকে রক্ষা পেয়ে পালিয়েছে। আমরা তাে কাফিরদের মুকাবিলা করার জন্য যাচ্ছি, কিন্তু বাণিজ্যিক কাফেলার সাথেও আমাদের দেখা হবার সম্ভাবনা রয়েছে। তাদের উপর আক্রমণও হতে পারে। অতঃপর মদীনায় আমাদের পরিবার-পরিজন থাকবে। তাদেরও রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়ােজন আছে। অতএব, কিছু লােককে মদীনায় থাকতে হবে। অতএব, যথার্থ কৌশলই অবলম্বন করতে হবে। যেসব পরিবারে একাধিক লােক রয়েছে, তাদের মধ্যে কেউ থাকবে কেউ যাবে। তােমাদের কি পরামর্শ এ ব্যাপারে ?

 আর বকর সিদ্দীক (রাঃ) ঃ যদিও মদীনার মশরিক এবং ইয়াহুদীদের। সাথে চুক্তি হয়েছে তবুও তাদের ব্যাপারে কোন আস্থা রাখা সম্ভব নয়। কারণ, তারা বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে। এজন্য প্রিয়নবী (সাঃ) যে বিষয়টি চিন্তা। করেছেন সেটি সঙ্গত।

সাদ ইবন মুয়াজ (রাঃ)ঃ এ কথাটি আমিও বলতে চাচ্ছিলাম। রাত্রে। যখন আমি বিছানায় আরাম করছিলাম তখন আমি এ বিষয়টি কল্পনা করেছিলাম।

প্রিয়নবী (সাঃ) এ বিষয়টি নিজেও উপলব্ধি করেছেন। বস্তুতঃ নবী করীম (সাঃ)এর প্রস্তাবই যথাযথ এবং নেহায়েত জরুরী। 

 আবু আইউব আনসারী (রাঃ)ঃ কিন্তু এই সিদ্ধান্ত নেয়া জটিল, এখানে। কারা থাকবে আর কারা যাবেন নবীজীর সাথে? |

 প্রিয়নবী (সাঃ) ঃএ বিষয়টি লােকদের মর্জির উপর ছেড়ে দেয়া উচিত।

হযরত উমর (রাঃ)ঃ  সম্ভবতঃ জনসাধারণ এ বিষয়টি পরস্পরে। | মিমাংসা করতে পারবে না।। | 

নবী করীম (সাঃঃ এটা এমন কোন বিষয় নয় যে, নিজেরা সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না।।

হযরত উমর (রাঃ)ঃ যে পরিবারে দুইজন সেই পরিবার থেকে একজন যাবে, একজন এখানে থাকতে পারে। কিন্তু যে ঘরে দুইয়ের অধিক ব্যক্তি,

তারা কিভাবে সিদ্ধান্ত নিবে?

প্রিয়নবী (সাঃ)ঃ এর সমাধান এই হওয়া উচিত যে, যে ঘরে তিন ব্যক্তি থাকবে তাদের মধ্যে একজনু এখানে থাকবে। যে পরিবারে চার ব্যক্তি তন্মধ্যে দুইজন এখানে থাকবে। পাঁচজন হলেও দুজন থাকবে। ছয় অথবা সাত জন। হলে তিন জন থাকবে।

আউসঃ এ বন্টনও যথার্থ। ” 

নবী করীম (সাঃ) ঃ যেহেতু সবাই উপস্থিত আছে তাই এখনই বাছাইয়ের | কাজটা হয়ে যাক। বাছাইয়ের সময় বাদানুবাদ শুরু হলাে। সবাই চান রাসূলে কারীম (সাঃ)এর সাথে যেতে। এ নিয়ে বাকবিতণ্ডা হলাে। এমনকি বাদানুবাদ শুরু হলাে ভাইয়ে ভাইয়ে, পিতা-পুত্রে। হযরত সাদ (রাঃ) এবং তার পিতা হযরত হুশাইমার বাক-বিতণ্ডা দীর্ঘতর হলাে। সাদ (রাঃ) স্বীয় পিতা হুশাইমাকে বললেন ও প্রিয় আব্ব ! আমি আপনার অনুগত সন্তান। অতীতেও আমি কোন অবাধ্যতা করিনি, ভবিষ্যতেও করবাে না। এ মুহূর্তে একটাই আবেদন করতে চাচ্ছি আপনার দরবারে।

হুশাইমাঃ প্রিয় বৎস! আমি বুঝতে পেরেছি তুমি কি দরখাস্ত করতে | চাও। তােমার যে আরযু, আমারও তাই আকাংখা। প্রিয়নবী (সাঃ)এর সাথে আমি যেতে চাই। তুমি আমাকে যেতে দাও।

সাদ ঃ আমি গণীমতের মাল চাই না, নাম-সুনাম চাই না। সুখ্যাতির কাঙ্গাল নই আমি। আমি চাই জান্নাত। শহীদ হলে বিনা হিসাব-কিতাবে জান্নাত পাওয়া যায়। জিহাদ করলে শাহাদাত নসীব হয়। কোন পার্থিব স্বার্থ হলে আমি আপনার ব্যাপারে কোন প্রকার হস্তক্ষেপ অবশ্যই করতাম না। কিন্তু ব্যাপারটি তাে সম্পূর্ণ পরকালীন। অনুগ্রহপূর্বক আপনি আমাকে এ থেকে । বঞ্চিত করবেন না। (১. তারীখে আলমে ইসলাম ঃ ১ম খণ্ড) |

 হুশাইমাঃ প্রিয় বৎস! তুমি যুবক, আমি বৃদ্ধ। তােমার জীবনে কত জিহাদেরই তাে সুযােগ আসতে পারে। আর আমার তাে এক পা কবরে চলে। গেছে। জানিনা কখন আমার মৃত্যু এসে যায়, আর জিহাদের সওয়াব থেকে বঞ্চিত হয়ে যাই। অতএব, তুমি আমাকে যেতে দাও। | 

সাদঃ আপনি জানেন, রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর নেতৃত্বাধীন তাঁর পতাকাতলে এ-ই হচ্ছে প্রথম জিহাদ। এই জিহাদে অংশগ্রহণ আমার মনের বিরাট সাধ। এবার আমাকে যেতে দিন। যদি আমি জীবন্ত ফিরে আসি তাহলে আপনার সাথে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ—ভবিষ্যতে কখনও আমি আর এরূপ জেদ ধরবাে না।।

হুশাইমাঃ  আমার মনােবাসনা ছিলাে তুমি তােমার মা এবং স্ত্রীর কাছে

থাকো।  তাদের এবং মুসলমানদের পরিবার-পরিজনদের রক্ষণাবেক্ষণ করাে। যুবকরা এ কাজ ভালাে করে আঞ্জাম দিতে পারে।

সাদঃ পরিবারের দেখাশুনা বয়স্করাই ভালাে করতে পারেন। যুদ্ধ করা। তাে যুবকদের কাজ।

” হুশাইমা ঃ আরে একটু লক্ষ্য তাে করবে। বিশ্ববাসী কি বলবে যে, ছেলেকে জিহাদের জন্য পাঠিয়ে দিয়ে নিজে ঘরে বসে আছে।

সাদঃ আববু ! আমি যদি না যাই, তাহলে এ বদনামীর কলংক আমার মাথায় লাগবে। সবাই বলবে, বৃদ্ধ বাপকে যুদ্ধে প্রেরণ করে একটি তাগড়া যুবক ঘরে বসে আছে। আপনি বলুন, আমি লােকসমাজে মুখ দেখাতে পারবাে? |

হুশাইমা ঃ আচ্ছা, তাহলে দুজনই চলাে।

সাদ ঃ এটাও সম্ভব নয়। কারণ, প্রথম তাে মেয়েদের কাছে আমাদের দুজনের কোন একজন থাকা আবশ্যক। দ্বিতীয়তঃ রাসূলুল্লাহ (সাঃ)এর নির্দেশ, একজন বাড়ীতে থাকবে আরেকজন জেহাদে যাবে। প্রিয়নবী (সাঃ)এর আদেশ কিভাবে অমান্য করবাে আমরা।

হুশাইমাঃ প্রিয় বৎস! তাহলে কি করা যাবে ?

সাদঃ আপনি আমায় অনুমতি দিন।

হুশাইমা ঃ আচ্ছা, ঠিক আছে তাহলে একটা কাজ করাে, লটারী দাও।

সাদঃ রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নিকট থেকে এর অনুমতি নিতে হবে।

হুশাইমা ঃ ঠিক আছে, নিয়ে এসাে।

তারা উভয়েই প্রিয়নবী (সাঃ)এর দরবারে হাজির হলেন। সেখানে গিয়ে দেখলেন, এই ধরনের আরাে বহু মুকাদ্দমা নিয়ে অনেকেই হাজির হয়েছে। হুশাইমাও নিজের এবং সাদ (রাঃ) এর বিষয়টি পেশ করলেন। দরখাস্ত করলেন, তাদের লটারীর অনুমতি দিতে।

প্রিয়নবী (সাঃ) লটারীর অনুমতি দিলেন। লটারীতে নাম আসলাে হযরত সাদ (রাঃ)-এর। তিনি খুব আনন্দিত হলেন। হুশাইমা বললেন ও আমি অন্যায়ভাবেই তােমার সাথে বাদানুবাদে লিপ্ত হয়েছি। এই সৌভাগ্য তােমারই। যাও, আল্লাহ তােমার তামান্না পূর্ণ করুন।

ছেলে সম্মানিত পিতার হস্ত চুম্বন করলেন। অতঃপর যাদের মধ্যে এই বিষয় নিয়ে বাদানুবাদ চলছিলাে, তারাও এরূপ লটারী দিলেন। লটারীতে। যাদের নাম আসলাে না, তারা সবাই হতাশ হলেন।।

প্রিয়নবী (সাঃ) ঃ তােমরা সবাই প্রস্তুত হয়ে মসজিদের সামনে সমবেত হও। আমি আমার অসুস্থ কন্যা রুকাইয়্যাকে একটু দেখে আসি।

প্রিয়নবী (সাঃ)এর আদরের দুলালী হযরত রুকাইয়্যা (রাঃ) দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। তাঁর বিবাহ সম্পন্ন হয়েছিলাে হযরত উসমান গণী (রাঃ)-এর সাথে। হযরত উসমান গণী (রাঃ) ছিলেন বিশাল বিত্তবৈভবের মালিক। প্রিয়নবী (সাঃ) মসজিদ থেকে উঠে হযরত উসমান (রাঃ)-এর বাড়ী পৌছলেন। যদিও তখন পর্দার হুকুম নাযিল হয়নি, মহিলারা বােরখাবিহীন যাতায়াত করতাে এবং এরূপ কামিজ পরিধান করতাে যেগুলাে গলা থেকে বুক পর্যন্ত ফাড়া থাকতাে। সে হিসাবে শুধু চেহারাই নয়, গলা এবং সিনা পর্যন্ত নজরে আসতাে। তবে রাসুলুল্লাহ (সাঃ)এর এ নিয়ম ছিলাে, যখন তিনি ঘরে অথবা কোন কন্যার বাড়ীতে যেতেন তখন দরজায় দাঁড়িয়ে অনুমতি প্রার্থনা করতেন। অনুমতি পেলে ঘরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতেন। এর উপকারিতা ছিলাে এই যে, ঘরের মধ্যে মেয়েলােক, কে কি অবস্থায় আছে, তাতাে জানা নেই। বিনা অনুমতিতে হঠাৎ করে প্রবেশ করলে হয়ত কারাে কোন কষ্ট হতে পারে, অথবা হতে পারে লজ্জিত।

আফসােস! আজকে মুসলমানরা প্রিয়নবী (সাঃ)এর এই সুন্নতের উপর খুবই কম আমল করে থাকে। তারা মনে করে আমাদেরই ঘর, আমাদের বাড়ী, যখন ইচ্ছে চলে যাবাে। এটা ঠিক যে, সেটা নিজের ঘর, যখন ইচ্ছে যেতে পারবে তবে নবীর সুন্নতের উপর আমল করা শুধু ভালই নয় বরং আবশ্যক। কেউ কেউকে বলতে শুনেছি যে, তারা এরূপ আকস্মিক ঘরে প্রবেশ করে। লজ্জা পেয়েছে।

 _ যাহােক, প্রিয়নবী (সাঃ) গৃহের দরজায় দাঁড়িয়ে প্রথমতঃ অনুমতি প্রার্থনা করলেন। হযরত উসমান (রাঃ) বাইরে বেরিয়ে আসলেন। নবীজী (সাঃ)কে সাথে নিয়ে তিনি ঘরে প্রবেশ করলেন। নবীজীর প্রিয় কন্যা হযরত রুকাইয়্যা (রাঃ) গৃহে সাধারণ একটি বিছানার উপরে পড়ে আছেন। গায়ে তার জ্বর। আনমনা অবস্থায় পড়ে আছেন। প্রিয়নবী (সাঃ)এর কদম মুবারকের আওয়াজ শুনে তিনি জাগ্রত হলেন। নবীজীকে দেখে সালাম করলেন। সালামের জওয়াব দিলেন নবীজী। বসে পড়লেন তাকিয়ার পাশে। কপালের উপর হাত রেখে আন্দাজ করলেন জ্বর কি পরিমাণ। কুশলাদি জিজ্ঞেস করলেন। দম করলেন। কিছু দুআ পড়ে। প্রিয় কন্যাকে লক্ষ্য করে বললেন ঃ আদরের দুলালী ! আমি জিহাদে রওয়ানা হচ্ছি। লােকজন প্রস্তুত। আমি বেশীক্ষণ দেরী করতে পারছি না।

হযরত রুকাইয়্যা (রাঃ) আফসােসের দৃষ্টিতে প্রিয়নবীর চেহারার দিকে তাকালেন। হযরত উসমান (রাঃ) আরয করলেন ঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকেও সাথে নিয়ে চলুন।

প্রিয়নবী (সাঃ) ও রুকাইয়্যা অসুস্থ। তুমি রুগীর শুশ্রুষায় এখানেই থেকে যাও।

প্রিয়নবী (সাঃ) ওখান থেকে মসজিদে তাশরীফ নিয়ে এলেন। ইত্যবসরে। সবাই এসে উপস্থিত হলেন। হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) সেই ঝাণ্ডাটি হাতে নিলেন যেটি নবী করীম (সাঃ) তৈরী করেছিলেন হযরত উবাইদা (রাঃ)-এর জন্য। নবী করীম (সাঃ) হযরত আবু লুবাবা ইবন মুনযির (রাঃ)কে মদীনার শাসক নিয়ােগ করলেন। অর্থাৎ, নিজের স্থলাভিষিক্ত বানালেন। মদীনার ঊর্ধ্বাংশ যাকে আলিয়া বলা হয়, তার আমীর নিযুক্ত করলেন হযরত আসিম ইবন আদী (রাঃ)কে।

রাসূলে আকরাম (সাঃ) সামনে কদম বাড়ালেন। হযরত আবু বকর। সিদ্দীক (রাঃ) ঝাণ্ডা হাতে নিয়ে উত্তোলন করলেন। পত পত করে পতাকা উড়ছে। সমস্ত সাহাবায়ে কেরাম সজোরে আল্লাহু আকবার ধ্বনি তুললেন।

সাহাবায়ে কেরাম আঁকজমকে জিহাদে রওয়ানা করলেন। পৌত্তলিক এবং ইয়াহুদীরা তাদের দিকে চোখ তুলে তাকাতে লাগলাে।

জিহাদের স্পৃহা

 ১২ই রমযানুল মুবারক ২য় হিজরীর রােববার দিন। প্রিয়নবী (সাঃ) মুজাহিদীনে ইসলামকে সাথে নিয়ে মদীনায়ে মুনাওয়ারা থেকে রওয়ানা হলেন। এই সৈন্যবাহিনীর সাথে অল্পবয়স্ক কিছু বালক সাহাবী ছিলেন। তাদের। বাপ-ভাইয়েরা যতই তাদেরকে বুঝিয়ে শুনিয়ে উপদেশ দিয়ে বাড়ীতে রেখে যাওয়ার চেষ্টা করলেন কিন্তু তারা ফিরলেন না। বরং খােষামােদ-তােষামােদ করে তারা সেনাবাহিনীর সাথেই রয়ে গেলেন। | বয়স সাকইয়া একটি জনপদের নাম। এটি মদীনার সংলগ্ন কবা এলাকার সন্নিকটে। নবী করীম (সাঃ) সেখানে বালক সাহাবীদেরকে নিজের সামনে তলব করলেন। বালকের সংখ্যা ছিলাে অনেক। কোন কোন ঐতিহাসিক বালকদের সংখ্যা ৬০ বলে উল্লেখ করেছেন। তন্মধ্যে বিখ্যাত। লােকদের যেসব বালক সন্তান ছিলেন তাদের নামের তালিকা নিম্নরূপঃ

১। আবদুল্লাহ ইবন উমর ইবন খাত্তাব (রাঃ) 

২। উসামা ইবন যায়েদ (রাঃ) 

৩। রাফে ইবন খাদীজ (রাঃ) 

৪। বারা ইবন আযিব (রাঃ)।

৫। উসাইদ ইবন হুযাইর (রাঃ)।

৬। যায়েদ ইবন আরকাম (রাঃ)

৭। যায়েদ ইবন সাবিত (রাঃ)। 

৮। উমায়র ইবন আবিস (রাঃ)

তাছাড়া আরাে অনেক ছিলেন মহিলা। সবাই নবী করীম (সাঃ)এর কথার প্রতি খুব গুরুত্বারােপ করতেন। তাঁর কথা মেনে চলতেন। রাসূলে আকরাম। (সাঃ) বালকদেরকে নিজের সম্মুখে তলব করলেন, হযরত বেলাল হাবশী (রাঃ) গােটা বাহিনীতে এ হাজিরার ঘােষণা দান করলেন। ঘােষণা শােনামাত্রই সমস্ত বালক সাহাবী প্রিয়নবী (সাঃ)এর সামনে এসে হাজির হলেন। নবীজী (সাঃ) তাদের দেখে বললেন ও প্রিয় বৎসরা! তােমরা এখনাে কমবয়স্ক তােমাদের যাবার প্রয়ােজন নেই। তােমরা বাড়ীতে ফিরে যাও।

এতদশ্রবণে সবাই নিশ্চপ হয়ে গেলেন। কেউ কোন কথা আরয করার সাহস পেলেন না। কিন্তু তাদের অন্তরে ছিলাে জিহাদী জোশ, শাহাদাতের স্পৃহা। এজন্য তাদের মনের আকাংখা ছিলাে, যে যত কিছুই বলুক সব কথা শােনার পরেও তাদেরকে যেন ত ত দেয়া হয়। অতএব, হযরত উমায়ের (রাঃ) আরয করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! জিহাদে যাবার বড়ই আকাংখা আমাদের অন্তরে। আপনি যদি আমাদের ফেরত পাঠান তাহলে আমাদের মন : ভেঙ্গে যাবে।

প্রিয়নবী (সাঃ) ঃ তােমরা এখনাে কমবয়স্ক। কখনও যুদ্ধে অংশগ্রহণ। করােনি। তােমাদের জানা নেই যুদ্ধের আগুন কত তেজ ও প্রচণ্ড | কত দ্রুত এ অগ্নি দাউ দাউ করে জ্বলে উঠে। আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়ে। কেউ তার আওতায় আবদ্ধ হলে জ্বলে পুড়ে ভস্ম হয়ে যায়।।

| উমায়ের ঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা যুদ্ধের বহু উপাখ্যান শুনেছি। আমরা . জানি, লড়াইয়ের সূচনা কিভাবে হয় এবং পরবর্তীতে কি রূপ ধারণ করে।

আমাদের অন্তরে শাহাদাতের আকাংখা। আমরা শহীদ হলে কি জান্নাতের উপযুক্ত হবাে না? 

প্রিয়নবী (সাঃ) ঃ হবে না কেন? আল্লাহর রহমত ব্যাপক। যারা শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে জিহাদ করে, চাই পুরুষ হােক কিংবা মহিলা বা বালক, শাহাদত লাভ করলে জান্নাতে যাওয়া তার জন্য সুনিশ্চিত। ” 

উমায়ের ঃ তাহলে আমাদের অনুমতি দিন। আমরা শহীদ হয়ে জান্নাতে প্রবেশ করতে চাই। |

 প্রিয়নবী (সাঃ)ঃ প্রিয় বৎসরা ! তােমাদের এখনও বয়স হয়নি। খুব সম্ভব যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে তােমরা পালাতে আরম্ভ করবে। যারা রণক্ষেত্র

থেকে পলায়ন করে আল্লাহ তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হন। এর ফলে তােমরা সওয়াবের স্থলে গুনাহ অর্জন করবে।

উমায়ের ঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা জান দেব কিন্তু আমাদের কদম পিছু। হটবে না। বস্তুতঃ আমাদের মনের আকাংখা হচ্ছে, আপনি আমাদের। মুরুববীদের নিয়ে একদিকে থাকন। আর মক্কার নিয়ন্ত্রণহীন তথাকথিত। সম্মানিত নেতাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য আমাদেরকে অনুমতি দিন। আমরা তাদের শিক্ষা দিয়ে ছাড়বাে। প্রমাণ করবাে যে, আল্লাহর বান্দা এবং রাসূলের গােলাম, ইসলামপ্রিয়, ধর্মের জন্য উৎসর্গকৃত যুবকরা কত বড় বীরবাহাদুর হয়ে থাকে। 

প্রিয়নবী (সাঃ)এর নিকট তার কথাগুলাে খুবই ভালাে লাগলাে। তিনি বললেন, আমার স্নেহের যুবকরা ! তােমাদের এই জিহাদী জোশ শত সহস্র। প্রশংসার যােগ্য। মুসলমান প্রতিটি নর-নারী এবং বালকের অন্তরে জিহাদের এরূপ স্পৃহা থাকা উচিত। জিহাদের এই জোশ-স্পৃহা ঈমানী শক্তির প্রমাণ। তবে যে যুদ্ধে আমরা যাচ্ছি সেটি হচ্ছে ইসলাম ও কুফরের প্রথম যুদ্ধ। আল্লাহ ভালাে জানেন, এই যুদ্ধের পরিণাম কি। এইজন্য তােমরা বাড়ীতে চলে যাও। এটাই তােমাদের জন্য শ্রেয়। 

রাফে ইবন খাদীজ (রাঃ) ও প্রিয়নবী (সাঃ)এর আনুগত্য আমাদের উপর ফরয। তবে ফিরে গেলে আমাদের মনে কষ্ট হবে। আমরা নিরাশ হবাে। 

প্রিয়নবী (সাঃ) ঃ আচ্ছা, ঠিক আছে তাহলে তােমরা দাঁড়াও। আমি নেজার উপর চিহ্ন দিচ্ছি। যাদের দেহ এ পরিমাণ লম্বা হবে তারা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারবে। এই বলে নবী করীম (সাঃ) নেজার মধ্যে চিহ্ন লাগালেন এবং বালকদের মাপতে আরম্ভ করলেন। অনেকেই চিহ্নিত দাগ সমান দীর্ঘ হলেন না। তারা মাপে টিকলেন না। রাফে ইবন খাদীজের পালা আসলাে—তিনি প্রিয়নবী (সাঃ)-এর হাত থেকে নেজাটি নিজে নিয়েই নিজের দেহ পরিমাপ করতে আরম্ভ করলেন। তার দেহ সামান্য একটু ছােট ছিলাে মাপের তুলনায়। এই দেখে তাড়াতাড়ি তিনি পায়ের পাঞ্জার উপর দাঁড়িয়ে মাপ নিলেন। প্রিয়নবী (সাঃ)কে সম্বােধন করে তিনি বললেন, দেখুন, আমার দেহ মাপে টিকে গেছে। প্রিয়নবী (সাঃ)এর নিকট তাঁর এই বিচক্ষণতা ভীষণ পছন্দ হলাে। তিনি মুচকি হাসলেন। বললেন, তােমার এই বিচক্ষণতা | প্রশংসার দাবীদার। জিহাদের স্পৃহা তােমাকে এই বিচক্ষণতা শিখিয়েছে। যাও। তােমাকে অনুমতি দিলাম, তুমি মুজাহিদদের অন্তর্ভুক্ত।

এতদশ্রবণে রাফে ইবন খাদিজ এতই আনন্দিত হলেন যেন দুনিয়ার। বিশাল দৌলত পেয়ে গেছেন।


এলাে উমায়ের ইবন ওয়াক্কাসের পালা, তার দেহও মাপের তুলনায়। কিছুটা ছােট ছিলাে। নবীজী (সাঃ) তাকে প্রত্যাবর্তনের নির্দেশ দিলেন। ফলে। উমায়ের কাঁদতে আরম্ভ করলেন। তার কান্না নবীজীর অন্তরে ভীষণ প্রভাব বিস্তার করলাে। ফলে তিনি তাকে সাথে যাওয়ার অনুমতি দিলেন। তিনিও খুব খুশী হলেন। তাঁর বড় ভাই সাদ তাঁর গলায় তরবারী ঝুলিয়ে দিলেন।

আরেকটি বালককে পরিমাপ করার পর নবীজী বললেন ঃ তুমি এখনাে ছােট। বালক সাহাবী আরয করলেন, আমি উমায়ের থেকে বড়। আপনি মাপুন। নবী করীম (সাঃ) তাকে উমায়ের (রাঃ)এর সাথে দাঁড় করালেন। সে সাহাবী পায়ের পাঞ্জার উপর উঁকি মেরে দাঁড়ালেন। ফলে, উমায়ের-এর তুলনায় এক ইঞ্চি বড় প্রমাণিত হলেন। তাঁর এই আচরণও নবীজীর (সাঃ) কাছে খুব পছন্দ হলাে। তাকেও নবীজী (সাঃ) মুজাহিদদের অন্তর্ভুক্ত করলেন।

আরেক বালক আরয করলেন, আমি উমায়ের অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী এবং বীরবাহাদুর। নবী করীম (সাঃ) উমায়েরের সাথে তাঁকে কুস্তিতে লাগিয়ে দিলেন। এই বালক হযরত উমায়ের (রাঃ)কে ধরাশায়ী করে ফেললেন। প্রিয়নবী (সাঃ) তাকেও সাথে নিয়ে নিলেন। অন্যান্যদের দিলেন ফেরত। (তারীখে ইসলাম ঃ ১ম খণ্ড, ৪ পৃষ্ঠা ২৭।)

রাসূলে আকরাম (সাঃ) মুসলিম মুজাহিদদের সংখ্যা গণনা করে দেখলেন। সর্বমােট ৩১০ জন। অবশ্য ঐতিহাসিক গ্রন্থাবলীতে ৩১৩-র কথা উল্লেখ রয়েছে। এদের মধ্যে কারাে নিকটই লৌহবর্ম ছিলাে না। না ছিলাে পূর্ণাঙ্গ, অস্ত্র-শস্ত্র। কারাে কাছে তলােয়ার থাকলে নেজা ছিলাে না, নেজা থাকলে। তলােয়ার ছিলাে না। তীর-কামানও সবার কাছে ছিলাে না। সওয়ারীগুলাের। মধ্যে ছিলাে ৭০টি উট, ২টি ঘােড়া। ১টি অশ্ব ছিলাে হযরত যুবাইর (রাঃ)-এর, অপরটি মিকদাদ (রাঃ)-এর।।

৩১৩ জন মুজাহিদের মধ্যে ৮০ জন ছিলেন মুহাজির আর ২৩৩ জন। ছিলেন আনসার।

জোহরের নামাযের সময় হলাে। হযরত বেলাল (রাঃ) আযান দিলেন। কুপের পানি দ্বারা সবাই অযু করলেন। নামায পড়লেন জামাতে। প্রিয়নবী (সাঃ) নামায পড়ে মদীনাবাসীদের জন্য দুআ করলেন—–আয় আল্লাহ! তােমার বান্দা, তােমার বন্ধু, তােমার নবী হযরত ইবরাহীম (আঃ) মক্কাবাসীদের জন্য দুআ করেছেন। আর তােমার বান্দা, তােমার নবী মুহাম্মাদ দুআ করছে। মদীনাবাসীদের জন্য। তুমি তাদের উপর বরকত নাযিল করাে। তাদের সা এবং মুদ্দে (পরিমাপের নির্ধারিত ওজন) এবং তাদের ফলগুলােতে, তাদের

শস্যদানায়। হে পরওয়ারদিগার! মদীনাকে আমাদের প্রিয় বানিয়ে দাও। তার। প্রতি আমাদের আকর্ষণ সষ্টি করাে। মদীনায় যেসব বিপদ-আপদ, বালা-মুসিবত রয়েছে সেগুলাে লাখমের দিকে স্থানান্তরিত করাে (লাখম একটি স্থানের নাম)। হে আমার পরওয়ারদিগার! মদীনার দুই প্রস্তরময় উপত্যকার মধ্যবর্তী জায়গাকে আমি নিরাপদ হেরেম স্থির করেছি, যেমনিভাবে তােমার দোস্ত হযরত ইবরাহীম (আঃ) মক্কাকে হেরেম স্থির করেছেন।

এই স্থানটিতে মাসউদও এসে পৌঁছে গেলাে। পৌছুলাে আদী ইবনুর। রাগবাও। তখন আবদুল্লাহ ইবন আমর হুযুর (সাঃ)এর খিদমতে হাজির হলেন। তিনি আরয করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এই স্থানটিতে অবস্থান। করুন। সেনাবাহিনীর খবর নিন। আমাদের অন্তরে জিহাদের পূর্ণ স্পৃহা বিদ্যমান। এটি একটি শুভলক্ষণ যে, বনী সালামা যখন মক্কার ইয়াহুদীদের উপর আক্রমণ করেছিলাে তখন এই স্থানটিকেই মনযিল বানিয়েছিলাে। এখানেই তাদের সৈন্যদের সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়েছিলাে। যারা যুদ্ধের উপযােগী নয় সেসব লােককে এখান থেকেই বিদায় দেয়া হয়েছে।

যুদ্ধের উপযুক্ত এখানেই তাদের হাতে অস্ত্র-শস্ত্র বন্টন করে দেয়া হয়েছে। | ইয়াহুদীরা যখন মক্কার দিকে রওয়ানা হলাে অথচ তারা ধনসম্পদ, জাঁকজমক, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং জনবলের দিক দিয়ে সবার শীর্ষে ছিলাে, তা সত্ত্বেও বনী সালামা তাদের উপর বিজয় লাভ করেছিলাে। মক্কার ইয়াহুদীরা পরাস্ত হয়েছিলাে চিরতরে। আল্লাহ যদি ইচ্ছা করেন তাহলে ইসলামের শত্রুরাও পরাস্ত হবে। পূর্বে যেমন আমরা প্রফুল্ল হয়েছিলাম, এরূপ ভাবেই মুসলমানরা আনন্দিত হবে। আল্লাহ তাআলা আপনার আঁখিযুগলকে ঠাণ্ডা করবেন।

প্রিয়নবী (সাঃ) ও আমরা অশুভ বলতে কোন জিনিসে বিশ্বাসী নই। তবে আল্লাহ তাআলার কাছে আশা করি ইসলামেরই বিজয় হবে। 

১২ই রমযানুল মুবারক, ২ হিরী, রােববার দিন প্রিয়নবী (সাঃ) আসরের নামায পড়ে সৈন্যদেরকে যাত্রার নির্দেশ দিলেন। মুসলমানরা পূর্বেই প্রস্তুত ছিলেন। হুকুম পাওয়ামাত্র রওয়ানা হলেন। সাবাহায়ে কেরাম ছিলেন। আনন্দিত, প্রফুল্ল। তাঁদের মনে আনন্দের জোয়ার বইছে। যেন কোথাও থেকে ধনসম্পদ আনতে যাচ্ছেন।

| সাবাহায়ে কেরাম উচ্চস্বরে নারায়ে তাকবীর—–আল্লাহু আকবার ধ্বনি তুললেন এবং নিয়মিত সেনাবাহিনীর মতােই পথ অতিক্রম করতে লাগলেন।




LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

নবীজির জীবনে ব্যবসা-বাণিজ্য

পুরো পৃথিবী সৃষ্টিকারী এবং প্রতিপালনকারী মহান আল্লাহ। রুটি-কাপড় এবং বাসস্থান হল মানুষের মৌলিক প্রয়োজন। . প্রয়োজন পুরা করার জন্য মানুষ...

রেকর্ড ভেঙে ইতিহাসের সর্বোচ্চ চূড়ায় রেমিট্যান্স.

করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যেও ইতিহাসের সব রেকর্ড ভেঙে জুলাই মাসে ২৬০ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। অতীতে কখনও এক...

বিদেশ গামী ব্যক্তিদের করোনা টেস্ট করার_নিয়মাবলীঃ

বহুদিন পর আন্তর্জাতিক বিমান খুলে দেয়ার পর অনেকেই দেশের বাহিরে যাওয়ার কথা ভাবছেন। কিন্তু সে ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট...

পবিত্র জুমা আদায়ের মধ্য দিয়ে মসজিদের মহান গৌরব ফিরে পেল আয়া সোফিয়া

ইতিহাসের স্বাক্ষী হতে আয়া সোফিয়ায় নামাজে উপস্থিত ছিলেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইপ এরদোয়ান। নামাজের আগে বিশেষ দোয়া অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে কুরআন...

Recent Comments

John Doe on TieLabs White T-shirt