Home ইসলামিক বিষয়াদি দেখুন বদর প্রান্তর বদর প্রান্তর-পর্ব ২৩: (আবু জেহেলের হঠকারিতা, মুযিযা ), ইসলামীক সিরিজ, চলবে…….

বদর প্রান্তর-পর্ব ২৩: (আবু জেহেলের হঠকারিতা, মুযিযা ), ইসলামীক সিরিজ, চলবে…….

আবু জেহেলের হঠকারিতা

 কুরাইশ বাহিনী এখনও জুহফায় অবস্থানরত। একজন বেদুঈন একটি উটনীর উপর আরােহণ করে হাজির হলাে। তার পাগড়ীর উপর একটি রুমাল এরূপভাবে বাঁধা যার কারণে তাকে চেনা যাচ্ছিলাে না। সেনাবাহিনীর নিকটে এসে লােকটি উটনীর উপর থেকে অবতরণ করলাে। অনুপ্রবেশ করলাে ক্যাম্পে। সে দেখলাে, স্থানে স্থানে উটের মাংস চুলার উপরে রান্না করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও ভূনা করা হচ্ছে। কোথাও মক্কার কাফিররা শরাবের পাত্র থেকে ঢক ঢক করে মদ গিলছে। 

উটনীর উপর আরােহী এই বেদুঈন সামনে অগ্রসর হলাে। মনে হলাে, কোন বিশেষ তাঁবু সে অন্বেষণ করছে। অতএব, অগ্রসর হতে হতে আবু জেহেলের তাঁবুর কাছে থামলাে। উটনীটিকে বাঁধলাে। আবু জেহেলের তাঁবুর নিকট লােকটি যেয়ে পৌঁছলাে। সেই তাঁবুর সামনে নেতার শান-শওকত বুঝাবার জন্য ছােট একটি ছায়াদার জায়গার ব্যবস্থা করা হয়েছিলাে। সেখানে। শামিয়ানার নিচে বসে ছিলাে আবু জেহেল, জামআ, হারিস, আখনাস ইবন। শরীক, উমাইয়া এবং আরও কিছুসংখ্যক বেদুঈন। আগন্তুক বেদুঈন জামা এবং সালােয়ারের উপর ঢিলা আস্তিন বিশিষ্ট একটি আলখাল্লা পরেছিলাে। এটা ছিলাে পায়ের গিরা পর্যন্ত প্রলম্বিত। মাথায় পাগড়ি, পাগড়ির উপর রুমালটি এরূপ ভাবে পরেছিলাে যে, তার সামনের দিকটার দুই কোণা বুকের উপর ঝুলন্ত ছিলাে। আর পিছনের দুটো লেজ ছিলাে স্কন্ধদ্বয়ের উপর। পাগড়ির উপর রুমাল জালি দ্বারা বাঁধা। জবার মধ্যে বুকের উপর বাবা ছিলাে একটি বন্ধনী মেখনা। তার মধ্যে খঞ্জর ঢকানাে ছিলাে। তলােয়ার

ছিলাে তার পার্শ্বদেশে ঝুলন্ত। দীর্ঘ কদম ফেলে সে ছাউনীর ভিতর প্রবেশ করলাে। সেখানে যেয়ে বললাে, লাত, উযযা তােমাদের সহায়তা করুন।

বেদুঈনটি সন্নিকটে পৌছলে আবু জেহেল তাকে চিনতে পারলাে। সে ছিলাে কায়েস ইবন আমরী। আবু জেহেল তাকে লক্ষ্য করে বললাে, ওহাে! কায়েস নাকি? হুবল আমাদের প্রতি দয়া করুন। তুমি তাে বাণিজ্যিক কাফেলার সঙ্গে গিয়েছিলে ? কি সংবাদ কাফেলার ? ।

কায়েসঃ কাফেলা দুশমনদের আক্রমণ থেকে রক্ষা পেয়েছে। সহি-সালামতে মনযিলে মকসুদ পর্যন্ত পৌছে গেছে।

এ সংবাদ শুনে সবাই আনন্দে আটখানা। কায়েস তার আলােচনার ধারা। অব্যাহত রেখে বললাে ও আবু সুফিয়ান আমাকে আপনার কাছে এইজন্য। প্রেরণ করেছেন যাতে আপনাকে এই সুসংবাদ শুনাই যে, কাফেলা নিরাপদ রয়েছে এবং আপনার দরবারে এ আবেদন জানাই যে, আপনি তাে কাফেলার সাহায্যের জন্য এসেছিলেন। কাফেলার কোন কষ্ট—তকলীফ হয়নি। অতএব, আপনি ফিরে চলে আসুন। | আবু জেহেল ও ফিরে চলে যাবাে?

কায়েসঃ হাঁ, ফিরেই চলে আসুন। কারণ, আমাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য। অর্জিত হয়ে গেছে।

আবু জেহেল তার সাঙ্গপাঙ্গদের দিকে সাধারণ একটি নজর দিয়েই। বললাে, তােমাদের কি মত? উতবা এবং শায়বাও তখন সে মজলিসে উপস্থিত। উতবা শায়বাকে লক্ষ্য করে বললােঃএই মরদুদের এখনাে ফিরে যাবার ইচ্ছে নেই বলে মনে হচ্ছে। | 

উমাইয়া ঃ আমি আপনাদের সাথে এসেছিলাম। আপনার যে ইচ্ছা আমার। মনােবাসনাও তাই। | আখনাস ইবন শরীকঃ আমরা কাফেলার সাহায্য এবং তাদের। হেফাজতের উদ্দেশ্যে এসেছিলাম। লাত, উযযা কাফেলার হেফাজত করেছে। কাজেই এবার ফিরে যাওয়া উচিত।

শায়বাঃ বাস্তব কথাও তাই। আমরা এসেছিলাম কাফেলার মদদের জন্য। কাফেলা সুখ-শান্তিতে নিরাপদেই লক্ষ্যস্থলে যেয়ে পৌছেছে। এবার সামনে অগ্রসর হলে আমাদের কি লাভ ? |

যামআঃ এই দুই যুবকের বক্তব্যই সঠিক। কিন্তু তােমাদের পরামর্শ যদি অন্য কিছু হয়ে থাকে তাহলে সামনে বলতে পারাে।

আবু জেহেলঃ আখনাস বনী যুহরার মিত্র। বনী যুহরা বনী হাশেমের

আত্নীয়। শায়বা বনী হাশেমের আপনজন। তাদের উক্ত বক্তবইস কারণ, তারা চায় না, মুহাম্মাদ এবং তার সাঙ্গপাঙ্গদের কোন কষ্ট হােক। তবে চিন্তা করতে হবে, বে-দ্বীন মুসলমানদের আমাদের স উপর আক্রমণ করার চিন্তার ধৃষ্টতা কিভাবে হলাে। এর কারণ এভs. আমাদের ভয় তাদের অন্তর থেকে উধাও হয়ে গেছে। আমরা এখানে ভ’ না করে ফেরত চলে গেলে মুসলমানদের ধৃষ্টতা আরও বেড়ে যাবে। সাহস বদ্ধি পাবে। অতএব, আমাদের আরও সামনে অগ্রসর হওয়া ১৬ আজকালকের মধ্যে বদরে মেলা বসবে। আমরা বদরে যাবাে। সেখানে তিন অবস্থান করবাে। লােকজনকে দাওয়াত করবাে। জাঁকজমকে খাতে। খাওয়াবাে। শরাব পান করবাে, উৎসব করবাে। গােটা আরবের সব কবীলার লােক আমাদের স্থির প্রতিজ্ঞা ও সাহসিকতা প্রত্যক্ষ করবে। প্রভাব পড়বে। সবার উপর আমাদের। মুসলমানরাও ভীত-সন্ত্রস্ত ও প্রভাবিত হবে। অতঃপর আমরা ফিরে চলে যাবাে। সবাই একযােগে বললাে, হাঁ, আপনার। রায় ঠিক।

কায়েসঃ আবু সুফিয়ান পয়গাম পাঠিয়েছেন যদি আপনারা ফিরে না যান। তাহলে যেন কণ্ঠশিল্পী, গায়িকাদের অবশ্যই ফেরত পাঠিয়ে দেন। কারণ, এসব কণ্ঠশিল্পী গায়িকা জাতীয় সম্পদ। সুরেলা ও সুমিষ্ট কণ্ঠের অধিকারিণী। এরা সুন্দরী, মায়াবিনী, ষােড়শী। গােটা হেজাজে তাদের সুখ্যাতি রয়েছে। | আবু জেহেল ও হাঁ, তা অবশ্য করা যাবে। এটা মেনে নেয়া যায়। গায়িকাদের অবশ্যই ফেরত পাঠানাে হবে। ফলে, এসব গায়িকাদের হাওদার। উপর আরােহণ করিয়ে তখনই জুহফা থেকে মক্কা অভিমুখে ফেরত পাঠানাে হলাে। আবু জেহেল সেনাবাহিনীকে যাত্রার নির্দেশ দিলাে। লােকজন তাদের তাঁবু উপড়াতে লাগলাে। গােছাতে আরম্ভ করলাে তাদের মাল-সামান। লােকজন যখন রওয়ানার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাে তখন আখনাস ইবন শরীক বনী যুহরার কাছে পৌঁছলাে। তারাও তখন তাঁবু উপড়াচ্ছিলাে। আখনাস বনা যুহরার শীর্ষস্থানীয় লােকদের আলাদা ডেকে বললাে ঃ হে বনী যুহরা ! তােমরা। এসেছিলে কাফেলার সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে। তােমাদের বাণিজ্যিক কাফেলা তাে নিরাপদ রয়েছে। আবু জেহেলের সাথে মুহাম্মাদের সাথে অন্তর্দ্বন্দ্ব। সে চান তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে, তাদের হত্যা করতে। কিন্তু মুহাম্মাদ তােমাদের ভাগ্নে। যদি সে সত্যিই নবী হয় তাহলে তার কারণে তােমরা ইহ-পরকাল” ইযযত-সম্মানের অধিকারী হবে। আর যদি সে মিথ্যুক হয় তাহলে না ভাগ্নেকে হত্যা করে গােটা জগদ্বাসীর সামনে কেন তােমরা অপমানিত ২ চলাে আমরা ফিরে যাই।

জনৈক ব্যক্তি বললাে ঃ কিন্তু আবু জেহেল এবং জাতিকে কি জবাব দিবে?

আখনাস ঃ আবু জেহেল কমবখত, সে স্বজাতিকে ধ্বংস করতে চায়। বাকী রইলাে জাতির প্রশ্ন। এ বিষয়টি আমার সােপর্দ করাে। ব্যর্থতার ইলজাম আমি আমার মাথায় তুলে নেবাে। আগে তােমরা প্রস্তুতি নাও।

সবাই একযােগে বললাে ঃ আমরা প্রস্তুত।

 আখনাসঃ তাহলে একটা কাজ করাে, যখন সেনাবাহিনী রওয়ানা হবে তখন আমি চিৎকার আরম্ভ করে উঠবাে, আমাকে সর্প দংশন করেছে। তােমরা সবাই আমার পাশে এসে ভীড় জমাবে। তােমাদের যদি অভিযাত্রার কথা বলা হয়, তাহলে তােমরা বলবে আমাদের সাথী সুস্থ হয়ে উঠলে আমরা পরক্ষণে আসছি। আর যদি সে মারা যায় তাহলে তাকে দাফন-কাফন করে। আসবাে। অতএব, এই সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হলাে। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই সৈন্যসামন্ত রওয়ানা করলাে। কিছু লােক চলতে আরম্ভ করলাে। আর আখনাস তখনই চিৎকার করে উঠলাে, আমাকে সাপে দংশন করেছে। গােটা – বনু যুহরা তার আশে পাশে সমবেত হলাে। এলাে আবু জেহেল সহ আরও কিছুসংখ্যক লােক। 

তারা এসে বললাে ঃ তােমরা রওয়ানা করাে। প্রতিউত্তরে তারা বললাে ঃ আমাদের সাথীকে সর্প দংশন করেছে। আমরা তার চিকিৎসা করাচ্ছি। 

আবু জেহেলঃ তাকে পালকির উপর বসিয়ে নিয়ে চলাে।। 

আখনাসঃ না, আমি এই জমিতেই সমাহিত হতে চাই। ( বাধ্য হয়ে আবু জেহেল তাকে সেখানে রেখেই চলে গেলাে। তাগিদ দিয়ে তাদের বলে গেলাে, রােগী একটু সুস্থ ও আরামবােধ করলেই তােমরা চলে। আসবে। দু’ তিন ঘন্টার মধ্যেই সাফ হয়ে গেলাে পুরাে ময়দান। চলে গেলাে করাইশের সর্বশেষ ব্যক্তিটিও। এবার আখনাস উঠে বসলাে। বললাে, তােমরা। প্রস্তুত হও।

সবাই সমস্বরে বললাে ঃ বিলকুল তৈয়ার।

আখনাস ঃ খুব ভালাে। তাহলে রওয়ানা করাে। মনে করাে আমরা বেঁচে গেছি। 

অতএব এরা সবাই প্রত্যাবর্তন করলাে। তারীখে ওয়াকিদীতে এদের সংখ্যা একশত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এরা এমন আনন্দিত হয়েছে যেন জেলখানা থেকে মুক্তি পেয়েছে।

মুজিযা

হযরত রাসুলে আকরাম (সাঃ) ‘বুয়ূতুস সাকইয়া’ নামক স্থান থেকে রওয়ানা করলেন। এখানে নবীজী (সাঃ) দুআ করলেন, ‘আয় আল্লাহ! একা মসলমান, পদাতিক বাহিনী। তাদের তুমি আরােহণের ব্যবস্থা করাে। এবা বস্ত্রহীন, তাদের পােশাকের ব্যবস্থা করাে। এরা ক্ষুধার্থ, তুমি তাদের খানায় ব্যবস্থা করাে। এরা মুহতাজ-মুখাপেক্ষী, তাদের তুমি নিজ দয়ায় অমুখাপেল্লী বানিয়ে দাও, ঐশ্বর্যশীল করাে।

 রাসূলে আকরাম (সাঃ) নিজ বাহিনীর মধ্যে একাধিক অধিনায়ক নিয়ত করলেন। পদাতিক বাহিনীর অধিনায়ক নিযুক্ত করলেন কায়েস ইবন আবী সাসাআহ (রাঃ)কে। আরােহীদের আমীর নিযুক্ত হলেন হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ)। প্রিয়নবী (সাঃ) একটি কূপের কাছে গিয়ে থামলেন। তিনি হযরত কায়েস ইবন আবী সাংসাআহ (রাঃ)কে বললেন ঃ বাহিনীকে পুনরায়। গণনা করাে। তিনি গণনা করে বললেন, এরা সর্বমােট ৩১৩ জন। তন্মধ্যে রয়েছেন কয়েকজন বালকও।

এখান থেকে রওয়ানা করে ‘বাতনুল আতীক’-এ পৌছলেন তাঁরা। সেখান থেকে মাকানকাসের পথে চললেন গিয়ে পৌছলেন ‘বাহা ইবন জুবাইরে। প্রিয়নবী (সাঃ) একদিনে এতটুকু পরিমাণই সফর করতেন যাতে কারাে কষ্ট না হয়। বাতহা ইবন জুবাইরে’ পৌছার পর দ্বি-প্রহর হয়ে গেলাে। সেখানে ছিলাে একটি গাছ। সবাই সেখানে অবতরণ করে অবস্থান করলেন। নবী করীম (সাঃ) বৃক্ষটির ছায়ার নিচে গিয়ে বসলেন। হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) একত্র করলেন কতগুলাে পাথর। তারা সবে মিলে সেই গাছের নিচেই পাথরগুলাে জমা করে একটি মসজিদের রূপ দান করলেন। রাসুলে আকরাম | (সাঃ) জোহরের নামায এই মসজিদে জামাত সহকারে আদায় করলেন। | এ বৎসরই, অর্থাৎ দ্বিতীয় হিজরীতে রােযা ফরয হয়েছিলাে। সফরে। রাসূলে করীম (সাঃ) দুই দিন রােযা রেখেছিলেন। অতঃপর আর রােযা। রাখেননি। লােকজনকেও বললেন ঃ তােমাদের রােযা রাখতে হবে না। অনেক সাহাবী অধিক সওয়াবের আশায় রােযা ভাঙ্গলেন না। | রাসূলে আকরাম (সাঃ) ঘােষণা দিলেন ঃ হে আমার সাহাবী সম্প্রদায় ! তােমরা রােযা ভেঙ্গে ফেলাে। এ সফরে রােযা ভেঙ্গে ফেলাই উচিত। আমি নিজেও রােযা ভেঙ্গেছি। তােমরা নিজেরাও তাই করাে। তােমাদের যেন নাফরমানদের তালিকাভুক্ত না করা হয়। এই ঘােষণা শােনার সাথে সাথেই

সাহাবায়ে কেরাম রােযা ভেঙ্গে ফেললেন। কারণ, তাঁরা চান না তাদের নাম। কিছুতেই অবাধ্যদের অন্তর্ভুক্ত হােক। যারা পূর্বে অধিক সওয়াবের আশায়। রােযা ভাঙ্গেননি, তাঁরাও রােযা ভঙ্গ করলেন।

তার পরদিন রাসূলে আকরাম (সাঃ) এখান থেকে রওয়ানা করে মাল উপত্যকায় পৌছলেন। সেখানে কোন তাঁবু বা শিবির কিছুই ছিলাে না। যেখানে অবস্থান করছিলেন সেখানে ছিলাে বালুর উচু উচু টিলা। এসব টিলার। নিচে এবং উটের ছায়ায় সাহাবায়ে কেরাম আশ্রয় নিলেন। অন্য কোন ছায়ার। ব্যবস্থা তাদের ছিলাে না। গরম এত তীব্র আকার ধারণ করেছিলাে যে, মরুভূমির বালুগুলাে প্রচণ্ড উত্তপ্ত হয়ে পড়েছিলাে। এতাে উত্তাপ যে, শস্যদানাও ভাজা হয়ে যাবার মতাে। আরবদের পায়ের স্যাণ্ডেল এত গরম হয়ে যেতাে যে, পায়ের তালু পর্যন্ত জুলতে আরম্ভ করতাে। প্রবাহিত হয়েছিলাে লু হাওয়া, যাকে বলা হয় ‘বাদে সামূম। এতাে মারাত্মক তেজ হাওয়া বয়েছিলাে যার ফলে বালুর টিলাগুলােকে এক জায়গা থেকে অপর জায়গার দিকে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিলাে। প্রচণ্ড গরম শরীর ঝলসে দিচ্ছিলাে। তেজ হাওয়ার ফলে বালুগুলাে, যখন শরীরের উপর পড়তাে তখন গায়ে ফোসকা পড়ে যেতাে। গায়ের মধ্যে যেন লাগতাে অগ্নিস্ফুলিংগ। যেদিন নবীজী তিরইয়াক নামক স্থানে পৌছলেন সেদিন লু হাওয়া কিছুটা কম ছিলাে। কিন্তু সূর্যের তাপ ছিলাে প্রচণ্ড।

রাসূলে আকরাম (সাঃ)এর অনতিদূরেই একটি হরিণ এসে দাঁড়ালাে। তখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ)এর নিকটে দাঁড়ান ছিলেন হযরত সাদ ইবন আবী ওয়াক্কাস (রাঃ)। রাসূলে কারীম (সাঃ) ইরশাদ করলেনঃ সাদ তুমি হরিণটি দেখেছাে?

সাদ (রাঃ) হরিণটির দিকে লক্ষ্য করেই কামানের মধ্যে তীর রেখে ধনুকের ছিলা টানলেন। প্রিয়নবী (সাঃ) দাঁড়িয়ে তার মাথা মুবারক সাদ (রাঃ)এর কান এবং স্কন্ধদ্বয়ের মাঝখানে রেখে বললেন, সাদ ! তীর ছােড়াে। অতঃপর এ দুআও করলেন, হে আল্লাহ! সাদের তীরকে লক্ষ্যবস্তুতে পৌছাও। অতঃপর সাদ (রাঃ) তীর ছুড়লেন। রাসূলে কারীম (সাঃ)এর প্রভাবে হযরত সাদ (রাঃ)এর তীর লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে গিয়েছিলাে। তার বিবরণ ঃ | তীরটি এরূপভাবে যাচ্ছিলাে যে, ‘আমি মনে করেছিলাম লক্ষ্যভ্রষ্ট হবে। কিন্তু | আমার বিস্ময়ের সীমা রইলাে না যখন দেখলাম তীরটি ঠিকই হরিণের গর্দানে যেয়ে পড়লাে। সেখানেই লুটিয়ে পড়লাে হরিণটি। আমি প্রিয়নবী (সাঃ)এর দিকে তাকালাম। তিনি মুচকি হাসছিলেন। আমি অনুধাবন করতে পারলাম, | এটা প্রিয়নবীর মুজেযা বা অলৌকিক ঘটনা।

রাসুলে আকরাম (সাঃ) আমাকে বললেন ঃ যাও, হরিণটিকে জবাই করে নিয়ে এসাে।

সাদ (রাঃ) বললেন, আমি দৌড়ে যেয়ে দেখলাম হরিণটি এখনও জীবিত।

এটিকে জবাই করলাম। হাজির করলাম নবীজীর (সাঃ) সামনে। রাসলে ‘ আকরাম (সাঃ) হরিণের গােশত টুকরাে করিয়ে চামড়া দিয়ে ঢেকে রাখলেন। তিনি আমাকে নির্দেশ দিলেন, বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম পড়ে বন্টন করে দাও। অতএব, হরিণের গােশত সমস্ত সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে বন্টন করে দিলাম। মুসলমানদের কাছে ছিলাে না জবাই করার মতাে কোন উট, যেগুলাে সাহাবায়ে কেরামের মাঝে বন্টন করা যায়। জবাইয়ের উটই বা পাবে। কোথেকে, আরােহণের জন্যই তাে তেমন উট ছিলাে না। এরা সাথে করে নিয়ে। এসেছিলেন খেজুর এবং ছাতু। কোন সময় খেজুর খেতেন আবার কখনও খেতেন পানি দিয়ে গুলিয়ে ছাতু। মদীনা থেকে বেরিয়ে এই উপত্যকার মধ্যেই হরিণের গােশত তাদের ভাগ্যে জুটলাে।

মুজাহিদীনে ইসলাম প্রকৃত অর্থেই মুজাহিদ ছিলেন। তাঁরা নিজেদের নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ করেছেন। ক্ষুধার্ত হলে খেজুর খেয়েছেন, একটু পানি পান করেছেন। প্রচণ্ড উত্তাপ যখন অনুভূত হয়েছে তখন বিশ্রাম নিয়েছেন উটের ছায়ায়। কোন কোন সময় প্রচণ্ড গরমের মুহূর্তে নিজের শরীরে ফোসকাও পড়েছে। মন বিষিয়ে উঠেছে, ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে কিন্তু তাদের ললাটে অসন্তোষের ভাঁজ পড়েনি। বিপদের মুহূর্তে সর্বদা তারা মুচকি হেসেছেন। আল্লাহু আকবার! তাঁরা কিরূপ লােক ছিলেন। কতটুকু ধৈর্য ও অটলতা ছিলাে তাঁদের মধ্যে। তাঁরা পার্থিব কোন কষ্টকেই কষ্ট মনে করেননি। কোন মুহুর্তেই কোন প্রকারের অভিযােগ—শেকায়েত ছিলাে না তাদের মধ্যে।। সময়মত জামাত সহকারে নামায আদায় করতেন। সামান্যতম শিথিলতাও এ ব্যাপারে তাঁরা প্রদর্শন করেননি। এসব সাহাবায়ে কেরামের নাম মুখে উচ্চারণ করাও আমাদের জন্য বেয়াদবী। দ্বীনের চেরাগ তাঁরা প্রজ্জ্বলিত করেছেন। সে আলাের দ্বারাই আজ পৃথিবী উজ্জ্বল।

এসব পূত-পবিত্র সাহাবায়ে কেরামের জীবনী লেখা এবং পড়ার মধ্য দিয়ে আমাদের মত গােনাহগারদের আখেরাত সুসজ্জিত হতে পারে। আয় আল্লাহ! আমাদের গােনাহ মাফ করে দিন। ইহ ও পরকালে উজ্জ্বল রাখুন। আমাদের চেহারাগুলােকে। জাহান্নামের আগুন থেকে আমাদেরকে পরিত্রাণ দান করুন।

যাহােক, প্রিয়নবী (সাঃ) নির্দেশ দিয়েছিলেন একেকটি সওয়ারীর উপরে দু’জন/তিনজন করে পালাক্রমে আরােহণ করতে। তা সত্ত্বেও কোন কোন

সাহাবী স্বীয় পালা অন্যদের দান করেছিলেন। নিজে পায়দল চলতেন অন্যদের। আরােহণ করার জন্য। মূলতঃ তারা ছিলেন সওয়াবের কাঙ্গাল। প্রতিটি কাজেই তাঁরা সওয়াব অর্জন করতে চাইতেন।

হযরতে রাসূলে আকরাম (সাঃ) লাবীস এবং আদীকে কুরাইশের সংবাদ আনয়নের জন্য গােয়েন্দা হিসেবে পাঠিয়েছিলেন। এরা বদরে যেয়ে সংবাদ। এনেছেন যে, আবু সুফিয়ানের কাফেলা সেখানে অত্যাসন্ন। রাসূলে আকরাম (সাঃ) ইরশাদ করলেন ও ইনশাআল্লাহ, আল্লাহ তা’আলা আমাদের দুটি থেকে যে কোন একটি দান করবেন। হয় কাফেলার গনীমতের মাল, না হয় কাফির। সেনাবাহিনীর উপর বিজয়।।

রাসূলে আকরাম (সাঃ) বহু মনযিল অতিক্রম করে ২য় হিজরীর ১৭ই রমযান শুক্রবার দিবাগত রাত্রে বদর নামক স্থানে গিয়ে পৌছলেন।

মূলতঃ বদর একটি কূপের নাম। এই নামের একটি জনপদও সেই কুয়ার সন্নিকটে আছে। সেখানে ছিলাে বালুর অনেকগুলাে টিলা। টিলাগুলাে বিক্ষিপ্ত। এগুলাে অত্যন্ত উঁচু এবং সুদীর্ঘ ছিলাে। টিলাগুলাের পিছনে সৈন্য লুকিয়ে থাকলেও সন্ধান পাওয়ার কথা নয়। টিলার পাদদেশে ছিলাে বদর নামক কৃয়াটি।

সাহাবায়ে কেরাম সেখানে অবস্থান করলেন। জামাত সহকারে আদায় করলেন ইশার নামায। নামায শেষে কিছুসংখ্যক সাহাবী বালুর উপর বসে। কুরআন শরীফ তেলাওয়াত করছিলেন। বিভিন্ন প্রকার ধর্মীয় বিষয়াদি সম্পর্কে আলােচনা করতে লাগলেন। সারকথা, তাঁরা সেখানে যেয়ে ঘুমাননি। যদিও দীর্ঘক্ষণ হলাে সূর্য অস্তমিত হয়েছে। কিন্তু বালু এখনও ঠাণ্ডা হয়নি। এই উত্তপ্ত বালুতেই সাহাবায়ে কেরাম বিক্ষিপ্ত অবস্থায় পড়ে আছেন।

রাসূলে আকরাম (সাঃ) হযরত আলী (রাঃ), জুবাইর ইবন আওয়াম, সাদ ইবন আবী ওয়াক্কাস, ইবন আমরকে তলব করে তাঁদের বললেন ও তােমরা খুব সতর্কভাবে এবং নীরবে কূয়ার কাছে যেয়ে কুরাইশের অবস্থা। | জেনে এসাে। তবে দেখাে, ‘যরীব’ পাহাড়ের দিকে যাবে। তার নিচে নেমে ‘কালীব’ পর্যন্ত পৌঁছবে। এরপরে সামনে অগ্রসর হবে না। 

 ‘যরীব’ বদরের একটি পাহাড়ের নাম। ‘যরীবের’ পাদদেশে রয়েছে কালীব নামক একটি কুপ। নির্দেশ পাওয়া মাত্রই এরা রাতের অন্ধকারে সেখানে যেয়ে পৌছলেন। চাঁদ তখনও উদিত হয়নি। কিন্তু চাঁদের কিরণ দিগন্তে কিছুটা ছড়িয়ে পড়ছে। যাতে বােঝা যায়, অতি শীঘ্রই চন্দ্র উদিত হবে। এরা বালুর টিলার পিছন দিয়ে পেরিয়ে ‘যরীব’ পাহাড়ে পৌছলেন। সেখান থেকে অবতরণ করলেন নিচে। তখন চাঁদ উদিত হয়েছে। চাঁদের আলাে ছড়িয়ে পড়েছে। কুয়ার

কাছে পৌঁছার পর তাঁরা দেখলেন, কুরাইশের কতগুলাে দাস পানি বহন করছে। কুপ থেকে পানি ভর্তি করছে তাদের পাত্রগুলােতে। তাদের দেখে সাহাবায়ে কেরাম তাদের উপর আক্রমণ করলেন। অনেকগুলাে গােলাম ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে “মুসলমান এসে গেছে, মুসলমান এসে গেছে” এই বলে চিৎকার করে পালাতে লাগলাে।

 তিনজন গ্রেফতার হলাে তাদের হাতে। তন্মধ্যে একজন ছিলাে উবায়দা ইবন সাদের গােলাম। দ্বিতীয় জন মুনইয়া ইবনুল হাজ্জাজের দাস আসলাম। তৃতীয় জন ছিলাে উমাইয়া ইবন খালফের ক্রীতদাস রাফে’। হযরত আলী (রাঃ) সহ অন্যান্য সাহাবায়ে কেরাম তাদের গ্রেফতার করে রাসূলে কারীম (সাঃ)এর দরবারে হাজির করলেন। নবীজী তখন নামায আদায় করছিলেন। সাহাবায়ে কেরাম তাদের জিজ্ঞেস করলেন, তােমরা কারা? প্রতিউত্তরে তারা বললাে, আমরা কুরাইশ সেনাবাহিনীর সাকি। সেনাবাহিনীর লােকজন পানি। ভর্তি করে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমাদের প্রেরণ করেছে। 

সাহাবায়ে কেরাম জানতেন, আবু সুফিয়ানের কাফেলা এখানে কাছেই আশেপাশে কোথাও আছে। এজন্য তাঁরা মনে করলেন, সাকিরা মিথ্যা বলছে। এজন্য তাদের বললেন, তােমরা মিথ্যে বলছাে। আসলে তােমরা আবু সুফিয়ানের কাফেলার লােক। এই বলে তাদের মারতে লাগলেন। মারের চোটে ওরা স্বীকার করলাে, আমরা কাফেলার লােক। আবু সুফিয়ানের কাফেলা এই টিলার অপর দিকে অবস্থান করছে। ইতােমধ্যে রাসূলে আকরাম (সাঃ) নামায থেকে অবসর হলেন। তিনি বললেন, কত বড় আফসােসের কথা ! ক্রীতদাসগুলাে যখন সত্য বলছিলাে তখন তােমরা তাদেরকে পিটিয়েছিলে। যখন মিথ্যা বলেছে তখন তাদের মার বন্ধ করে দিয়েছাে।

সাহাবায়ে কেরাম আরয করলেন, এরা বলছে, কুরাইশ বাহিনী এসে গেছে। 

 প্রিয়নবী (সাঃ)ঃ তারা সত্য বলেছে।

প্রিয়নবী (সাঃ) গােলামগুলােকে সামনে ডেকে জিজ্ঞেস করলেনঃ করাইশের সেনাবাহিনী কোথায় ?

একজন ক্রীতদাস আরয করলাে, এই সুবিশাল টিলার পিছনে। 

প্রিয়নবী (সাঃ)ঃ সেনাবাহিনীর সাথে কারা কারা এসেছে?

ক্রীতদাসঃ আবু লাহাব ব্যতীত শীর্ষস্থানীয় সব নেতাই এসেছেন। 

প্রিয়নবী (সাঃ)ঃ এদের কেউ প্রত্যাবর্তন করেছে ? 

গােলামঃ আখনাস ইবন শারীক বনী যুহরাকে নিয়ে ফিরে চলে গেছেন। 

প্রিয়নবী (সাঃ)ঃ এই সেনাবাহিনীতে লােকসংখ্যা কত?

গােলাম ঃ প্রচুর লােক এসেছে। সঠিক সংখ্যা আমাদের জানা নেই।

প্রিয়নবী (সাঃ) ঃ দৈনিক তারা কতটি উট জবাই করে ?

 ক্রীতদাস ঃ একদিন দশটি, আরেক দিন নয়টি।

 প্রিয়নবী (সাঃ) ঃ মনে হয় নয়শ থেকে হাজার হবে। | 

রাসূলে করীম (সাঃ) সাহাবায়ে কেরামকে নির্দেশ দিলেন, এ গােলামগুলােকে হেফাজতে রেখাে। তাদেরকে কষ্ট দিবে না। সাহাবায়ে কেরাম। তাদেরকে নিয়ে গেলেন। প্রিয়নবী (সাঃ) হযরত আম্মার ইবন ইয়াসির এবং মাসউদ (রাঃ)কে নির্দেশ দিলেন কুরাইশের সংবাদ আনতে। আদেশ পাওয়া মাত্র তাঁরা দুজন রওয়ানা হলেন।

চলবে..

ইসলামিক সিরিজ….

ভাল লাগলে নিচের কমেন্ট বক্সে মতামত জানাবেন







1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

হারিয়ে যাওয়া তথ্য ফিরে পান সহবে ।। Card Recovery Software 100% Working

ডাউনলোড করতে এখানে ক্লিক করুন যে ভাবে সেটাপ দিবেন

ইসলামের দৃষ্টিতে জন্ম নিয়ন্ত্রণের বিধান (BIRTH CONTROLLING)

প্রশ্নঃ শরীয়তের দৃষ্টিতে জন্ম নিয়ন্ত্রণের বিধান কী ?উত্তরঃ বর্তমানে জন্ম নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন পদ্ধতি চালু আছে। কিছু স্থায়ী পদ্ধতি। কিছু অস্থায়ী পদ্ধতি।–স্থায়ী পদ্ধতি বলতে বুঝায়,...

এবার আর্ন্ত জাতিক পর্যায়ে পবিত্র হজ সীমিত করার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের শেষ সিদ্ধান্ত

বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসের ভয়াবহ সংক্রমণ পরিস্থিতিতে সৌদি আরব সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, সৌদি আরবের বাহির থেকে কোন দেশের হজযাত্রী এ বছরের হজ...

অবাক হবেন! আপনার করোনা হবেই না হয়তো।

নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত না হওয়া অনেকের শরীরে এমন ‘টি-সেল’ রয়েছে, যেটি এই ভাইরাসকে প্রতিহত করতে সক্ষম। কারণ...

Recent Comments

John Doe on TieLabs White T-shirt